হিমালয় সীমান্ত অঞ্চলে বরফধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বত মিলে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৬৫ ছাড়িয়েছে এবং আরও ১৫০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের নুয়াকোট জেলার কল্পনা মল্লা বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে দেখছেন প্রবল স্রোতে নিজের পুরো পরিবারের ভেসে যেতে। কল্পনা মল্লা কোনো রকম দৌড়ে বাড়ির ছাদে উঠে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। কিন্তু এই নারী চোখের সামনে তাঁর পুরো পরিবারকে ভেসে যেতে দেখেছেন।
বুধবার (২৬ আগষ্ট) নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বন্যা ও ভূমিধসে রাস্তাঘাট, সেতু ও বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্রকল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৭ আগষ্ট) সকাল পর্যন্ত ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ। আরও পাঁচ শতাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাঁরা মূলত পর্যটক।
কল্পনার বাড়ি সেই নুয়াকোট বাগমাতি প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। কল্পনা বলেন, তাঁর বাবা, মা, বোন এবং বোনের সন্তানেরা সবাই আকস্মিক ওই বন্যার তোড়ে ভেসে গেছেন।
কল্পনা আরও বলেন, ‘চোখের সামনে বন্যার স্রোতে আমার পরিবারের সদস্যরা ভেসে গেছেন। তাঁরা বন্যার কবল থেকে বাঁচতে পারেননি। পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। এ বন্যা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি ও আমার ছেলে কোনোমতে একটি বাড়ির ছাদে উঠে প্রাণে বেঁচেছি— কীভাবে বেঁচে গেলাম, তা নিজেরাও বলতে পারি না।’
কল্পনার ছেলে সুগম মাল্লা বলেন, তিনি হাত ধরে টেনে তাঁর মাকে বাঁচিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে আমি আমার ফোন বোনকে দিয়েছিলাম, যেন সে নিরাপদে থাকতে এবং সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু এখন ওর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, ফোনটিও বন্ধ। আমার আশঙ্কা, সেও হয়তো বন্যার তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে।’
স্থানীয় আরেক নারী গোমা পণ্ডিত বলেন, বন্যায় তাঁর মহিষসহ অন্যসব গবাদিপশু ভেসে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার কৃষিজমিও ভেসে গেছে। ১০ বস্তা শর্ষের বীজ, টন টন ভুট্টা ও ধান—সব শেষ। কিছুই অবশিষ্ট নেই।’
গতকালের এ বন্যা ও ভূমিধসে তিব্বতেও তিনজন প্রান হারিয়েছে। সেখানে আরও অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে বৃহস্পতিবার সকালে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির খবরে বলা হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
ঠিক কী কারণে হঠাৎ এমন বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, গতকাল তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্পের পরই এর সূত্রপাত। এ বন্যা ও ভূমিধসকে ২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে।

