বিস্তীর্ণ জলরাশি, ঢেউয়ের মৃদু গর্জন, খোলা আকাশ আর নদীর বুকজুড়ে বাতাসের দোলা-সব মিলিয়ে যেন সমুদ্রের আবহ। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী এলাকায় পদ্মার পাড়ে দাঁড়ালে এমন অনুভূতিই হয় অনেকের। তাই ছুটির দিন এলেই প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে ভিড় করেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
বিশেষ করে শুক্রবারসহ বিভিন্ন ছুটির দিনে বিকেল গড়াতেই পদ্মার পাড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। পরিবার নিয়ে কেউ আসেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউবা দলবেঁধে। নদীর পাড়ে বসে আড্ডা, শিশুদের খেলাধুলা, ঢেউয়ের সঙ্গে ছবি তোলা কিংবা খোলা বাতাসে কিছুটা সময় কাটানো—সব মিলিয়ে মুখর হয়ে ওঠে শয়তানখালী।
বিকেলের সূর্যের আলো যখন পদ্মার জলে পড়ে, তখন নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি আর ঢেউয়ের দোলা তৈরি করে অন্যরকম এক দৃশ্য। বাতাসে ভেসে আসে নদীর ঢেউয়ের শব্দ। দর্শনার্থীদের অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ধরে রাখেন সেই মুহূর্ত।
পরিবারসহ ঘুরতে আসা দর্শনার্থী বিশ্বজিৎ শীল (৪৫) বলেন, ‘এখানে এসে মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের পাড়ে এসেছি। নদীর বিশালতা ও ঢেউ খুবই সুন্দর। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি বেশ ভালো।’
আরেক দর্শনার্থী আবুল বাশার (৬০) বলেন, ‘ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে পদ্মার পাড়ে ঘুরতে এসে খুব ভালো লাগছে। নদীর বিশালতা, ঢেউ আর খোলা বাতাসে কিছু সময় কাটালে মনে হয় যেন সমুদ্রের পাড়ে আছি।’
স্থানীয়দের অনেকেই পদ্মার এই পাড়কে ভালোবেসে ‘গরিবের সমুদ্র’ বলে ডাকেন। তাদের মতে, সমুদ্র দেখতে দূরে যেতে না পারলেও পদ্মার পাড়ে এসে বিশাল জলরাশি ও ঢেউয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
দর্শনার্থীদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে পদ্মার পাড়ে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকান। বিভিন্ন ধরনের খাবার, চা-পানীয় ও শিশুদের পছন্দের নানা পণ্য নিয়ে বসেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দোকানেও বাড়ে বেচাকেনা। ফলে ভ্রমণপিপাসু মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, শয়তানখালীর পদ্মাপাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিন দিন মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ এখানে বেড়াতে আসছেন।
তবে পদ্মার এই মনোরম সৌন্দর্যের পাশেই রয়েছে ভাঙনের ভয়। প্রতিবছর নদীভাঙনে শয়তানখালী এলাকার বিভিন্ন অংশ বিলীন হচ্ছে। নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। একই সঙ্গে ভাঙনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পদ্মাপাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
দর্শনার্থী আবুল বাশার বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে এখানকার সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে শয়তানখালীর পদ্মাপাড় আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর পাড়ের কিছু অংশ ভাঙনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাই ভাঙন রোধের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শয়তানখালীর পদ্মাপাড়কে পরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে এটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাদের।
তাদের মতে, এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদনের সুযোগই বাড়বে না, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানেরও প্রসার ঘটবে।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ছুটির দিনে তাই শয়তানখালীর পদ্মাপাড় হয়ে ওঠে মানুষের মিলনস্থল। ঢেউয়ের শব্দে যেখানে মেলে সমুদ্রের অনুভূতি, সেখানেই আবার ভাঙনের আতঙ্ক মনে করিয়ে দেয়-পদ্মার সৌন্দর্য যেমন টানে, তার রুদ্ররূপও তেমনি কেড়ে নিতে পারে এই প্রিয় জায়গাটুকু।