বৈঠার ছন্দে মুখর আষাঢ়ের বিল, সালথায় নৌকা বাইচে উৎসবের আমেজ

বিলের জলে ছুটে চলেছে সারি সারি নৌকা। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টানে মুহূর্তেই এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিযোগিতার নৌযান। সঙ্গে মাঝিদের হই-হুল্লোড় আর উদ্দীপনাময় স্লোগান। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো দর্শকের করতালি ও উল্লাসে মুখর চারপাশ। এমন উৎসবমুখর পরিবেশে ফরিদপুরের সালথায় ফিরে এলো আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড় গ্রামের বটতলা সংলগ্ন আষাঢ়ের বিলে স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্যোগে এ নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। নৌকা বাইচকে ঘিরে বসেছিল প্রাণবন্ত গ্রামীণ মেলাও। ফলে পুরো এলাকা পরিণত হয় শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ নানা বয়সী মানুষের মিলনমেলায়।

বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আষাঢ়ের বিলের দুই পাড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা দেখতে।

বাইচ শুরু হতেই যেন বদলে যায় বিলের চিত্র। মাঝিদের শক্ত হাতে বৈঠার টানে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে নৌকা। প্রতিটি নৌকা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উল্লাস ও করতালিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বিলের দুই পাড়।

কেউ নৌকা বাইচের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন, কেউবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন প্রতিযোগিতা। শিশুদের চোখে-মুখেও ছিল আনন্দের ছাপ। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জীবনের চেনা সেই উৎসবের আবহ ফিরে আসে আষাঢ়ের বিলে।

নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে বিলের পাড়ে বসে গ্রামীণ মেলা। মেলায় বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ পণ্য, বাহারি খাবার, খেলনা ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা।

শিশুদের জন্যও ছিল নানা বিনোদনের আয়োজন। ফলে শুধু নৌকা বাইচ নয়, মেলাকেও ঘিরে দর্শনার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় বাড়তি উৎসাহ।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নৌকা বাইচ উপলক্ষে মানুষের সমাগম হওয়ায় মেলায় বেচাকেনাও বেশ জমে ওঠে। এতে স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয়দের মতে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নৌকা বাইচের মতো আয়োজন শুধু বিনোদনই দেয় না, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও ধরে রাখে।

তারা বলেন, এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছেও বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনও আরও দৃঢ় হয়।

নৌকা বাইচ দেখতে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই জানান, মোবাইল ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের বাইরে এমন আয়োজন তাদের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়। বিলের পানিতে নৌকার ছুটে চলা, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এটি যেন গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক চেনা ছবির পুনরাবৃত্তি।

প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী দলগুলোর মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।

বিশেষ অতিথি ছিলেন সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার, জেলা স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মো. জাহিদ হোসেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার খায়রুল বাসার আজাদ এবং আটঘর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মুরাদুর রহমান।

এ ছাড়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আষাঢ়ের বিলের জলে বৈঠার ছন্দ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে এদিন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় গ্রামবাংলার পুরোনো সেই উৎসব। নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতা শেষ হলেও এর রেশ থেকে যায় দর্শনার্থীদের মনে—ঐতিহ্য আর আনন্দের এক স্মরণীয় বিকেল হয়ে।