এডুকেশন ওয়াচের বিশ্লেষণ

রাজধানীর সেরা ২০ উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ: কোন মানদণ্ডে এগিয়ে কারা?

শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-একাদশ শ্রেণিতে কোথায় ভর্তি হবে? পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনও ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। আর এ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে রাজধানীর শীর্ষ কলেজগুলোর একাডেমিক ফলাফল, জিপিএ-৫ অর্জন, পাসের হার ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকেই। এই বাস্তবতায় রাজধানী ঢাকার উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শীর্ষ ২০টি কলেজের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে শিক্ষা বিষয়ক পত্রিকা এডুকেশন ওয়াচ। এই তালিকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, পাসের হার, জিপিএ-৫ অর্জন, ধারাবাহিক একাডেমিক সাফল্য এবং সাম্প্রতিক ফলাফলের সামগ্রিক চিত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এডুকেশন ওয়াচের নির্বাচিত রাজধানীর সেরা ২০ উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের তালিকায় রয়েছে-
১. নটর ডেম কলেজ
২. আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ
৩. রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ
৪. ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
৫. হলি ক্রস কলেজ
৬. ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ
৭. সরকারি বিজ্ঞান কলেজ
৮. সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
৯. ঢাকা কলেজ
১০. ঢাকা সিটি কলেজ
১১. বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ
১২. মাইলস্টোন কলেজ
১৩. ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ
১৪. মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ
১৫. বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা
১৬. ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ
১৭. বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ
১৮. সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ
১৯. ঢাকা কমার্স কলেজ
২০. শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

শীর্ষে নটর ডেম
এডুকেশন ওয়াচের মূল্যায়নে তালিকার প্রথম অবস্থানে রয়েছে নটর ডেম কলেজ। দীর্ঘ সময়ের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৭টি পাবলিক পরীক্ষায় নটর ডেম কলেজের ৪৮ হাজার ৭৭৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হন ৪৮ হাজার ৪৮৬ জন এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেন ৩২ হাজার ৭৪১ জন। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি উত্তীর্ণ ও জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির সাফল্য উল্লেখযোগ্য।

ফলাফলে ধারাবাহিক অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো
তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের ১৭টি পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ২৯ হাজার ৮৯২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। উত্তীর্ণ হন ২৯ হাজার ৭৪৭ জন এবং জিপিএ-৫ পান ২০ হাজার ১০৪ জন।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা রাজউক উত্তরা মডেল কলেজেও দীর্ঘ সময় ধরে পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জনে ধারাবাহিকতা দেখা যায়। একই সময়ে ২৩ হাজার ২৬৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩ হাজার ২৩৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৭ হাজার ৪৭০ জন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্ষেত্রেও ফলাফলে ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের ১৭টি পাবলিক পরীক্ষায় ৩০ হাজার ৬৭৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩০ হাজার ৪২৬ জন উত্তীর্ণ হন এবং জিপিএ-৫ পান ১৮ হাজার ৬৭১ জন।

হলি ক্রস কলেজ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, ঢাকা কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজসহ তালিকাভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘ সময়ের ফলাফলে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

শুধু জিপিএ-৫ কি সাফল্যের মাপকাঠি?
এখানেই সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-একটি কলেজকে ‘সেরা’ বলার মাপকাঠি কী? শুধু জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মান নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, একটি কলেজে কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের প্রাথমিক একাডেমিক অবস্থান কী ছিল, পাসের হার কত, কত বছর ধরে ফলাফলে ধারাবাহিকতা রয়েছে-এসব বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, সহশিক্ষা কার্যক্রম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ, শৃঙ্খলা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতিও একটি প্রতিষ্ঠানের মান বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ফলে কোনো একটি সূচকে এগিয়ে থাকা কলেজ সব শিক্ষার্থীর জন্যই যে সেরা হবে-এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়।

র‍্যাংকিংয়ে কেন ভিন্নতা দেখা যায়?
রাজধানীর সেরা কলেজের তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের প্রকাশিত তালিকায় অবস্থানগত পার্থক্য দেখা যায়। এর মূল কারণ, র‍্যাংকিং তৈরির পদ্ধতি এক নয়। কেউ শুধু নির্দিষ্ট বছরের এইচএসসি ফলাফলকে গুরুত্ব দেয়, কেউ জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বিবেচনা করে, আবার কেউ কয়েক বছরের ফলাফল, পাসের হার ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পারফরম্যান্সকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করে। তাই এডুকেশন ওয়াচের তালিকাকেও এডুকেশন ওয়াচের নিজস্ব মূল্যায়নভিত্তিক র‍্যাংকিং হিসেবে দেখা উচিত। অন্য কোনো গণমাধ্যম বা শিক্ষা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের তালিকার সঙ্গে ক্রমে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়।

ভর্তির আগে শিক্ষার্থীর কী দেখা উচিত?
কলেজের র‍্যাংকিং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি ধারণা দিতে পারে। তবে শুধু তালিকায় অবস্থান দেখে কলেজ নির্বাচন করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীর পছন্দের বিভাগ, এসএসসি ফলাফল, ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য, কলেজের শিক্ষার পরিবেশ, যাতায়াতের সুবিধা, ব্যয়, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং নিজের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেখানে একজন নির্দিষ্ট শিক্ষার্থী কতটা ভালোভাবে নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারবে। রাজধানীর কলেজগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের একাডেমিক সাফল্যের যে প্রতিযোগিতা, তা শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জন্য যেমন পছন্দের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি তৈরি করছে কঠিন সিদ্ধান্তের বাস্তবতাও। তাই ‘সেরা কলেজ’ খোঁজার পাশাপাশি নিজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত কলেজটি খুঁজে নেওয়াই হতে পারে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।