নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের দায় কি শুধু প্রকৃতির?

নেপালের নুওয়াকোটে সেনা শিবিরের বাইরে স্বজনহারা মানুষের ভিড়। দেওয়ালে সাঁটানো কাগজের তালিকায় কাঁপা আঙুল চলিতেছে-কোনো এক নামের পাশে হয়তো মিলিবে প্রিয়জনের খবর; কিন্তু তালিকা যত দীর্ঘ হইতেছে, অপেক্ষার প্রহরও ততই যেন দুর্বিষহ হইয়া উঠিতেছে। নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬৭৬। নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার। নেপালেই নিখোঁজ ২ হাজার ৪২৬ জন, তিব্বতে ৫৫৪। উদ্ধার অভিযান চলিতেছে; কিন্তু পাহাড়ি ভূখণ্ড, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে প্রতিটি ঘণ্টা এখন আশার সঙ্গে আশঙ্কারও লড়াই।

এই বিপর্যয়কে কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলিয়া দায় সারিয়া দেওয়া সহজ; কিন্তু বিজ্ঞানীরা সেই সহজ পথটি দেখাইতেছেন না। প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে এই বিপর্যয়ের কারণ মনে করা হইলেও পরবর্তী ভূকম্পন-তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গিয়াছে, লাংটাং লিরুং পর্বতের উচ্চভাগে হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধসই ভয়াবহ জলস্রোতের সূচনা করিয়াছিল। প্রশ্ন হইল, সেই হিমবাহ এতটা দুর্বল হইল কেন? উত্তরটির মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি লুকাইয়া রহিয়াছে। বিজ্ঞানীদের মতে, অস্বাভাবিক উষ্ণতা বরফ ও পাথরের মধ্যকার বন্ধন দুর্বল করিয়াছে, ফাটলে পানি ঢুকিয়াছে এবং পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করিয়াছে। হিমবাহ গলিতেছে, পারমাফ্রস্ট গলিতেছে, আর যাহা এতদিন পাহাড়কে ধরিয়া রাখিয়াছিল, সেই বরফই ধীরে ধীরে তাহার বন্ধন হারাইতেছে। নেপালের এই ঘটনা সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি ভয়াবহ প্রকাশ মাত্র।

অতএব, প্রশ্নটি শুধু ‘কেন বন্যা হইল’ নহে। প্রশ্ন হইল, কেন পাহাড় আজ পূর্বের চাইতে অধিক অস্থিতিশীল? ইহার উত্তর আমাদের সভ্যতার দিকেই ফিরিয়া আসে। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়াইয়া যে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস আমরা বায়ুমণ্ডলে ছাড়িয়াছি, তাহার অভিঘাত এখন শুধু তাপমাত্রার পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নাই। সেই উষ্ণতা পাহাড়ের ভূগোল পরিবর্তন করিতেছে। হিমবাহ সংকুচিত হইতেছে, বরফের নিচে জমাট বাঁধা ভূমি গলিতেছে, নতুন হ্রদ তৈরি হইতেছে, নদীর গতিপথ ও পানির ভারসাম্য বদলাইতেছে। হিমালয় এখন কেবল বরফের রাজ্য নহে, ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিরও ভূখণ্ড। আর এই ঝুঁকি নেপালের সীমান্তে থামিয়া থাকিবে না বলিয়া মনে করিতেছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

হিমালয়ের হিমবাহ হইতে যে নদীগুলি নামিয়া আসিয়াছে, তাহাদের উপর নির্ভর করিতেছে এশিয়ার শত শত কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। আজ অতিরিক্ত গলনে নদী ফুলিয়া উঠিবে, কাল সেই হিমবাহই যদি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে দেখা দিবে পানির সংকট। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন পাশাপাশি বন্যা ও খরার বীজ বহন করিতেছে। তবে কেবল জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সংকুচিত করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়াও দায়িত্ব শেষ হয় না। যেই সকল পাহাড় ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে, সেইখানে দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, হিমবাহ ও হ্রদ পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দুর্যোগ-প্রস্তুতি অপরিহার্য। বিজ্ঞানী হামিশ প্রিচার্ড সতর্ক করিয়াছেন, আরও তুষারধস ও বন্যা আসিবে এবং হিমবাহের সামনে হ্রদ যত বাড়িবে, বিপদও তত বাড়িবে। নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য রাখিয়া গিয়াছে। পাহাড়ে ভয়াবহ হড়পা বানের শব্দ সকল সময় কানে শোনা যায় না। কখনো তাহা শুরু হয় কয়েক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে, হিমবাহের ক্ষীণ ফাটলে, কিংবা পাথরের সঙ্গে বরফের একটি অদৃশ্য বন্ধন আলগা হইয়া যাইবার ভিতর দিয়া। তাহার পর একদিন পাহাড় প্রবল কাদামাটিজলের ঢল নামে। আর বিপর্যস্ত মানুষের আত্মীয়রা তখন দেওয়ালে সাঁটানো তালিকায় নাম খোঁজে প্রিয়জনের।

নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু মৃত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা গোনার ঘটনা নহে। ইহা পাহাড়ের নীরব পরিবর্তনেরও সংবাদ। পৃথিবী উষ্ণ হইতেছে, আর সেই উষ্ণতার অভিঘাত এখন পাহাড়ের বুকেও দৃশ্যমান। আজ নেপাল, কাল অন্য কোনো উপত্যকা। প্রকৃতি হয়তো সতর্ক করিতেছে-আমরা কি সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিতেছি?