শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হাওরসভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে...

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২২, ০০:৫৮

আমার জন্ম সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের ছোট্ট এক গ্রামে। আমার শৈশব কেটেছে সেখানেই। মাত্র দুই দশক আগেও যে হাওর আমি দেখেছি, এখনকার হাওর-প্রকৃতি অনেকটাই আর তেমন নেই। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আগে জঙ্গলের মতো জায়গা ছিল। সেই সব গাছের বেশির ভাগই কেটে সাফ করা হয়েছে। কারা কেটেছে এসব হিজল-করচের ঘন বন? কিছু গাছ কেটেছে হাওরপারের মানুষ। আর ইজারাদারেরা প্রতি বছর গাছ কেটে বিলে কাঁটা দিচ্ছেন দশকের পর দশক। ফলে কমে গেছে গাছগাছালির পরিমাণ।

একসময় ঘন গাছের সারির কারণে বর্ষাকালে যেসব লোকালয়ে ‘আফাল’ এসে আঘাত করতে পারত না অতটা, এখনকার দিনে হালকা বাতাস দিলেই সেসব বাড়িঘরে আছড়ে পড়ে ঢেউ। অতীতে হাওরের বিলগুলোতে অনেক রকম জলজ উদ্ভিদ ছিল। জলজ উদ্ভিদের ফল ছিল বেশ স্বাদের। তাছাড়া এসব জলজ উদ্ভিদ ছিল অনেকটা মাছের নিরাপত্তা চাদরের মতোন। হাওরের পানিতে ঘন জলজ উদ্ভিদের কারণে কেউ চাইলেই জাল দিয়ে সব মাছ ধরতে পারত না। ফলে হাওরে প্রচুর মাছ বাড়ত। আর এখন জলজ উদ্ভিদ নেই, পরিষ্কার পানিতে জাল দিয়ে ধরা হচ্ছে সব সাইজের মাছ। এজন্য আজকাল আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে হাওরের মাছ।

হাসান হামিদ

ছোটবেলায় দেখেছি, শীতে প্রচুর পাখি আসত হাওরে। বিকেলে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াত পাশের গ্রামগুলোতে। কিছু মানুষ জাল দিয়ে পাখি শিকার শুরু করল। ধীরে ধীরে কমতে থাকল পাখির সংখ্যা। এখন আগের মতো পাখি হাওরে আসে না। এভাবেই বদলে গেছে আমাদের হাওরসভ্যতার অনেক কিছু। বদলে যাওয়া হাওরের অনেক জায়গা দখল করে ভরাট করা হয়েছে, গড়ে উঠেছে লোকালয়, হাট-বাজার; সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি হয়েছে সহস্র সড়ক। এখানকার নদীগুলোতে পলি জমেছে ভীষণ, এগুলো খনন করা হয়নি দীর্ঘদিন। আর ফসল রক্ষার নামে প্রতি বছর অপরিকল্পিতভাবে হাওরগুলোতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাত যখন হলো, তখন নাব্যসংকটের কারণে এবার হাওরে বন্যার ভয়ংকর রূপটি আমরা দেখলাম।

হাওরে বিশেষত সুনামগঞ্জে এবারের বন্যা ঠিক অতীতের বন্যার মতো ছিল না। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যা হয়। আকস্মিক বন্যায় পানিতে তলিয়ে যায় পুরো সুনামগঞ্জ এবং সিলেটের কিছু অংশ। সুনামগঞ্জ জেলা সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পানিতে তলিয়ে যায় অসংখ্য বাড়িঘর, অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট। টানা চার দিন মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও বন্ধ ছিল। লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। অসহায় হয়ে পড়ে সবাই। বিদু্যত্ না থাকায় রাতের অন্ধকারে ডাকাতের কবলে পড়ে কিছু এলাকা। এ যেন এক ভয়ংকর দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ব। এখানকার মানুষ গত কয়েক যুগে এমন ভয়াবহ বন্যা কিংবা দুর্ভোগ দেখেনি।

প্রশ্ন হলো, সুনামগঞ্জে এবারের বন্যার ভয়াবহতা বেশি কেন ছিল? বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যার ব্যাপকতা দিনে দিনে বাড়ছে। প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে বলা যায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ব্যাপকভাবে গাছ ও পাহাড় কাটা হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। এই পাহাড়গুলো কিন্তু পানি শোষণ করতে পারত। পাহাড় কাটার কারণে পানি শোষণ করতে পারছে না। এই পরিস্হিতিতে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি হয়েছে অনেক বেশি। সাধারণত ভারতের চেরাপুঞ্জীতে পুরো বছরে বৃষ্টি হয় ৫ হাজার মিলিমিটার। কিন্তু এ বছর মাত্র ছয় দিনেই ১২০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া হাওরগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ, নদী খনন না করা এবং অবৈধ দখল— এসব কারণে পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে।

হাওর এলাকার ঠিক কতটুকু আসলে ভরাট-দখল হয়েছে? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের সাত জেলায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর জায়গা জুড়ে মোট ৩৭৩টি হাওর রয়েছে। আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি হাওর রয়েছে সুনামগঞ্জে। এই জেলায় ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩১ হেক্টর ভূমিতে ৯৫টি হাওর রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের করা এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালের দিকে হাওরের আয়তন ছিল ৩ হাজার ৩৪ বর্গকিলোমিটার। আর ২০২০ সালে তা কমে হয়েছে ৪০৬ বর্গকিলোমিটার।

এর মানে, তিন দশকে দেশে হাওর কমেছে ৮৬ শতাংশ। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় ১৯৮৮, ১৯৯৪, ২০০০, ২০০৬, ২০১৩ ও ২০২০ সালের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল—এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাওর ভরাট হয়েছে। এর মানে হলো, এতে হাওরে বৃষ্টির পানি ধারণের ক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ফলে এবার সিলেটসহ আশপাশে বন্যার ভয়াবহতা দেখা গেছে। বৃষ্টি হলে হাওর এলাকা অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে। এ ছাড়া হাওরের সঙ্গে নদ-নদীর সংযোগ থাকার কারণে প্রাকৃতিকভাবে হাওরের পানি নদীতে চলে যায়। এখন সমস্যা হলো, হাওরে যে নদীগুলো আছে, সেগুলোরও পানি বহনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। সাধারণত মেঘালয় বা আসাম থেকে আসা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নদীপথে হাওর থেকে বের হয়ে মেঘনা বা যমুনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। কিন্তু এ বছর বন্যার পেছনে হঠাত্ উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানি বের হতে পারেনি। কারণ নদীগুলোর নাব্য কমে গেছে।

হাওরাঞ্চলে যেসব সড়ক বা উ®য়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, এর বেশির ভাগই সুপরিকল্পিতভাবে হয়নি। আর সেটা না হওয়ার কারণেই এবার বন্যা এত ভয়াবহভাবে হয়েছে। উন্নয়নের নামে যেখানে খুশি রাস্তা বানানো, ভরাট করে স্থাপনা তৈরি—এসব হাওরের সাধারণ চিত্র। হাওরের ভেতর দিয়ে যেসব সড়ক হচ্ছে, তার দুই পাশে বসতি গড়ে উঠছে। এ জন্য গত জানুয়ারি মাসে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে হাওরে এখন থেকে অ্যালিভেটেড বা উড়াল সড়ক করা হয়। হাওরে এখন বিভিন্ন জায়গায় যত্রতত্র উঁচু বাঁধের মতো করে রাস্তাঘাট করা হয়েছে। এসব কারণে পানি প্রবাহে বাধা তৈরি হচ্ছে। তাই বন্যার পানি এখন নেমে যেতেও সময় লাগে। সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় মানুষ ও বাসাবাড়ি দিনে দিনে বাড়ছে। নতুন বাসা তৈরি হচ্ছে অনেক জায়গা ভরাট করে।

অনেকেই হয়তো জানেন না, হাওরাঞ্চল নিয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর আছে। অবশ্য অধিদপ্তর গঠনের ২২ বছর পরও হাওর-জলাভূমি সংরক্ষণে মাঠ পর্যায়ে তারা কোনো কাজই করতে পারেনি। কেন পারেনি, সে আরেক বিস্ময়! এই অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে মানুষের টেকসই জীবনমান উন্নয়ন। এতে উন্নয়নের কথা বলা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের কথা বলা নেই! গত ২২ বছর ধরে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে মাসে বেতন-ভাতা খেলেও তাদের বলতে গেলে কোনো কাজ করতে হয় না।

আসল কথা হলো, নদী ও হাওর ভরাট করার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সেটা আমরা গত কয়েক বছর ধরেই টের পাচ্ছি। ভারী বৃষ্টি হলে এখন হাওরে প্রায় বছরই ফসলহানি হয়। এবার হলো ভয়াবহ বন্যা। তাছাড়া হাওরাঞ্চলের অনেক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট যেটুকু আছে, সেটুকুও হুমকির মুখে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় হাওরের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায় না। যেসব প্রকল্প করা হয় হাওরে, তা-ও উদ্দেশ্যমূলক লুটেরা বাহিনীর কাজ বলা যায়। আর এসব অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে উলটো হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস হয়। সরকার যদি হাওরসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাহলে এখনই কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করি।

লেখক: তরুণ কথাসাহিত্যিক

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন