যানজটে আটকা পড়িয়া অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর মৃত্যু!

মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটিয়াছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও হইতে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকা জুড়িয়া যানজটের সৃষ্টি হয় গত শুক্রবার সকাল হইতে শনিবার রাত্রি পর্যন্ত। এই সময় অ্যাম্বুলেন্সে দীর্ঘ সময় ধরিয়া আটকা পড়িয়া প্রাণ হারাইয়াছেন আমিরুন্নেছা। তাহার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের প্রাণভগবতীপুর গ্রামে। এই দিন দিনভর ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়িয়া নাকাল হন হাজার হাজার যাত্রী। তবে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বহীনতায় আমিরুন্নেছার এই মৃত্যু লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। এই মৃত্যুর খবর সমগ্র দেশের সংবেদনশীল ও বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়াছে।

আমরা জানি, জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর জীবন বাঁচাইতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অ্যাম্বুলেন্সকে সড়ক ব্যবহারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করিয়া থাকে। কেননা মানুষ মানুষের জন্য এবং বিপৎকালে একজন আরেক জনের সাহায্যে আগাইয়া আসিবেন-ইহাই মনুষ্যত্বের দাবি। অনেক দেশে এই জন্য আইনগত কিছু বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে। সাইরেন বা ইমার্জেন্সি লাইট জ্বালানো অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সকে গতিসীমা অতিক্রম করিবার অনুমতি প্রদান করা হয়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশসমূহে যানজট লাগিলে চালকদের জন্য রাস্তার মধ্যে বা পার্শ্বে অ্যাম্বুলেন্সের যাওয়ার মতো ফাঁকা জায়গা তৈরি করা আইনত বাধ্যতামূলক; কিন্তু প্রশ্ন হইল, এমন ব্যবস্থা তৈরি করিতে আমরা কতটা সচেতন? উন্নত দেশসমূহে (যেমন-যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইউএই) ‘ইমার্জেন্সি ভেহিকল প্রায়োরিটি’ (EVP) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স মোড়ের কাছাকাছি আসিলে জিপিএস সেন্সরের মাধ্যমে ট্রাফিক লাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবুজ হইয়া যায়। এই সকল দেশে এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু বা হাইওয়েতে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কোনো টোল লওয়া হয় না। বাস/ইমার্জেন্সি লেন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিংগাপুর বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অ্যাম্বুলেন্সকে পথ না দিলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনিতে হয়। এমনকি লাইসেন্স বাতিল বা জেল পর্যন্ত হইতে পারে; কিন্তু আমাদের দেশে কেহ কাহাকে ছাড় দিতে তেমন রাজি হন না। অনেক সময় এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয় যে, অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না।

আলোচ্য ঘটনায় দেখা যায়, সেতু মেরামতের কাজ চলতে থাকায় উল্লিখিত স্থানে এক লেন ব্যবহারের কারণে যানজটের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। এই সময় হাইওয়ে পুলিশ অ্যাম্বুলেন্সকে রং সাইড দিয়া পার করিতে যথাসম্ভব চেষ্টা করিয়াছে বটে; কিন্তু যাত্রী হিসাবে আমাদের সকলের যে নৈতিক সহযোগিতা প্রদান করা দরকার ছিল তাহা করিতে পারি নাই। আমরা সচেতন হইলে হার্ট অ্যাটাকের রোগী সেই নারীকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হইত। মূলত যানজটে কোনো অ্যাম্বুলেন্স আটকা পড়িলে সঙ্গে সঙ্গে রেসকিউ লেন তৈরি করিতে হইবে। রাস্তা দুই লেনের হইলে এই সময় বাম লেনের গাড়িগুলি একদম বামে এবং ডান লেনের গাড়িগুলি একদম ডানে সরিয়া গিয়া মাঝখানে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ তৈরি করিবে। আর রাস্তা তিন বা তাহার অধিক লেনের হইলে একদম বাম লেনের গাড়িটি আরও বামে সরিবে, আর বাকি সকল লেনের (মধ্যম ও ডান) গাড়িগুলি ডান দিকে চাপিয়া যাইবে। ইন্টারসেকশন বা মোড়ে থাকিলে মোড় পার হইয়া গাড়ি ডানে বা বামে চাপাইয়া লইতে হইবে। বিশেষ করিয়া হাইওয়েতে ইমার্জেন্সি লেন সকল সময় খালি রাখা বাঞ্ছনীয়। কোনো স্থানে সিগন্যাল পুলিশ না থাকিলে বা যানজট তীব্র হইলে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে আমাদের সাময়িকভাবে সামনের গাড়িগুলিকে দুই পাশে সরাইতে অনুরোধ করিয়া অ্যাম্বুলেন্সকে পার করিয়া দিতে হইবে। ফুটপাত বা মোড়ের মুখে গাড়ি পার্ক করিয়া অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের পথ সংকুচিত করা যাইবে না।

মোটকথা, যানজটে পড়িয়া ও অ্যাম্বুলেন্সে থাকিয়া পথিমধ্যে আমিরুন্নেছার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এই ঘটনার পরও যদি আমাদের হুঁশ ফিরিয়া না আসে এবং আমরা সকলে সচেতন না হই, তাহা হইলে তাহা হইবে আরও দুঃখজনক।