বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতারও শক্তি

লোডশেডিং বাড়লে অন্ধকার নামে ঘরে, অর্থনীতিতে এবং রাজনীতিতেও বিদ্যুৎ নেই অন্ধকার ঘর। বিদ্যুৎ নেই ফ্যান চলে না, পানির পাম্প চলে না, লিফট বন্ধ, হাসপাতালের সেবা ব্যাহত, দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য থমকে যায়। বিদ্যুৎ নেই কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়, অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল সেবা ব্যাহত হয়। আর যখন বিদ্যুৎসংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনই দুর্বিষহ হয় না; সরকারের ওপরও তৈরি হয় তীব্র জনচাপ।

বিদ্যুৎ তাই কেবল একটি পণ্য নয় এটি আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক অবকাঠামো। একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সচল, শিল্প কতটা উৎপাদনশীল, মানুষের জীবনযাত্রা কতটা স্বাভাবিক এবং সরকার জনগণের কাছে কতটা কার্যকর তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। আজ বাংলাদেশ সেই জায়গাতেই বড় একটি পরীক্ষার মুখোমুখি।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো দেশের স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা কম নয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই ক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (ইচউই) তথ্য অনুযায়ী, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশের মোট গ্রিড-সংযুক্ত স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। ক্যাপটিভ, অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য ও অন্যান্য ক্ষমতা যোগ করলে মোট ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াটেরও বেশি। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই সর্বোচ্চ সরবরাহকৃত চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা কত’ এটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনের সময় কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে, কত বিদ্যুৎ গ্রিডে পৌঁছাচ্ছে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এসে এই প্রশ্নটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্যাসের সংকটের কারণে ৬২টি উৎপাদন ইউনিট জ্বালানি-স্বল্পতায় আক্রান্ত ছিল এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক এবং দুটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। এখানেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার মূল সংকটটি স্পষ্ট হয়। কাগজে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা এক জিনিস, আর মানুষের ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। ইচউই-এর জানুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সক্ষমতা ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ভেড়ামারা ১ হাজার মেগাওয়াট, ত্রিপুরা ১৬০ মেগাওয়াট, ঝাড়খণ্ডের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট এবং নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখন শুধু দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমদানি সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়; এটি সংকট মোকাবিলার একটি উপায় মাত্র। আমদানি করা বিদ্যুতের মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, চুক্তির শর্ত এবং সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীলতা সবই জাতীয় বিদ্যুৎ নিরাপত্তার অংশ।

আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও অতীতে অর্থ পরিশোধ, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ২০২৫ সালে রয়টার্স জানিয়েছিল, বকেয়া অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধের মধ্যে ঝাড়খণ্ডের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি দীর্ঘ সময় কম ক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছিল। সুতরাং বিদ্যুৎ নিরাপত্তা মানে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয় জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রিড সক্ষমতা সবকিছুর সমন্বয়।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে। বিদ্যুতের আওতা বেড়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি অতিরিক্ত সক্ষমতা, কম ব্যবহার, উচ্চ ব্যয়, জ্বালানিসংকট, বকেয়া বিল এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো সমস্যাও জমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করুক বা না করুক, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের যে ব্যবস্থা সেটিই ক্যাপাসিটি চার্জ। এই ব্যবস্থার যৌক্তিকতা আছে, কারণ উৎপাদনক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য কেন্দ্রকে অর্থ দিতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্ষমতা সৃষ্টি হলে সেই অর্থের বোঝা রাষ্ট্রের ওপর পড়ে।

সাম্প্রতিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা দেওয়ার হিসাব করা হয়েছিল; ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছেÑএকদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হবে, অন্যদিকে মানুষ বিদ্যুৎ পাবে না এটি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, কিন্তু চাহিদার সময় উৎপাদন হচ্ছে না। বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে কোথাও পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ ধরনের বৈপরীত্য একটি সুস্থ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার লক্ষণ নয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জ্বালানি কাঠামোয় প্রায় ৪৯ শতাংশ বিদ্যুৎ দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, ২০ শতাংশ কয়লা থেকে, ১৭ শতাংশ আমদানি থেকে এবং ১২ শতাংশ ফার্নেস অয়েল থেকে এসেছিল। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা এলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধাক্কা লাগে। বর্তমান সংকটের একটি বড় শিক্ষা হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, সেই কেন্দ্রগুলো চালানোর জ্বালানির নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।

গ্যাস অনুসন্ধান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, খঘএ আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য সবগুলোকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা কী বলে?
বিদ্যুৎসংকট যে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে, তার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ শ্রীলঙ্কা। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময় জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে। কোনো কোনো সময়ে দৈনিক ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। এই সংকট দ্রুত রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হয়। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ, দেশব্যাপী আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত ‘আরাগালায়া’ গণআন্দোলনের মুখে রাজাপক্ষকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে হন।  পাকিস্তানেও বিদ্যুৎসংকট বহুবার জনবিক্ষোভের কারণ হয়েছে। ২০২৫ সালে উত্তর পাকিস্তানে দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা কারাকোরাম হাইওয়ে অবরোধ করেছিলেন। ইরাক, ঘানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, লিবিয়া ও তিউনিসিয়ায় বিদ্যুৎ বা জ্বালানিসংকট বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। কোথাও তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে, কোথাও বৃহত্তর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার ঘটনাও বলে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে কোনো সরকারই নিছক কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখার ঝুঁকি নিতে পারে না। নেপালেও একসময় দৈনিক ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল। শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুৎসংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার উন্নতির ফলে দেশটি লোডশেডিংয়ের যুগ থেকে বেরিয়ে এসে বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ইতিহাসের শিক্ষা পরিষ্কার বিদ্যুৎসংকটকে অবহেলা করলে তা একসময় অর্থনৈতিক সংকটে, আর অর্থনৈতিক সংকট জনঅসন্তোষে পরিণত হতে পারে।

যাহোক, বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদে যে কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করা সম্ভব, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সব বিদ্যুৎকেন্দ্রে চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার জাতীয় স্বার্থ, মূল্য, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি ব্যয় এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের গ্যাস-সম্পদ অনুসন্ধানেও দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত দরকার। সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার ছাদ, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং কৃষি সেচে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা, বিলবোর্ড, অতিরিক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং অপচয় কমাতে হবে। কিন্তু সাশ্রয়ের নামে যদি শিল্প উৎপাদন বা হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার অর্থনৈতিক মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিদ্যুৎসংকট সরকারের জনপ্রিয়তারও পরীক্ষা : সরকারের জনপ্রিয়তা শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না। একজন সাধারণ নাগরিক সরকারের সাফল্য বিচার করেন তার দৈনন্দিন জীবন দিয়ে। তিনি দেখেন ঘরে বিদ্যুৎ আছে কি না, পানি উঠছে কি না, ফ্যান চলছে কি না, সন্তানের পড়াশোনা হচ্ছে কি না, ব্যবসা চলছে কি না, কারখানা চলছে কি না, হাসপাতালে চিকিৎসা স্বাভাবিক আছে কি না। এসবের উত্তর যদি বারবার ‘না’ হয়, তাহলে সরকারের উন্নয়নের পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। এ কারণেই বিদ্যুৎসংকট একটি রাজনৈতিক ঝুঁকিও।

লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক