শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ সংস্কৃতি

অনেক জল্পনাকল্পনা আর দেনদরবারের পর সিলেটের বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচের অনুমতি মিলেছে। তবে শর্তসাপেক্ষে এবং শর্তটা খুবই সাদামাটা ‘এইবারই শেষ, ভবিষ্যতে আর না’। জানা যায় দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা ইউনিয়নে সুনাই নদীতে বর্ষাকালে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও আয়োজকেরা এই প্রতিযোগিতার তারিখ নির্ধারণ করে। ঠিক সে সময়ই এই প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে এলাকার কিছু লোক। প্রথমে ফেসবুকে স্ট্যাটাস, অতঃপর ২০ আগস্ট স্থানীয় এক মসজিদে ‘লাউতা ইউনিয়ন তৌহিদী জনতা’ সভা করে প্রতিযোগিতাটি বাতিল করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানায়। (সমকাল, ২২ আগস্ট, ২০২৬)। প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কী করেছিল বা কী সিদ্ধান্ত দিয়েছিল তা স্পষ্ট না হলেও জানা যায় গত ২৩ আগস্ট স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সিদ্ধান্ত হয় ‘পরের বছর থেকে আর নয়’ শর্তে এ বছরের পূর্বনির্ধারিত নৌকাবাইচটি হবে। থানার ওসিও জানিয়েছেন, আগামী বছর থেকে ঐ নদীতে আর নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে না, এমন শর্তে এবারের পূর্বনির্ধারিত সময়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে ঝামেলা মিটে গেছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন এই সমাধানের আড়ালে হাজারো অনুচ্চারিত প্রশ্ন চাপা দেওয়া হয়েছে; সময়ে সেসব যে আবার সামনে আসবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটা সামনে এসেছে, তা হলো হঠাৎ করে নৌকাবাইচ নিয়ে এমন করে খেপে যাওয়ার কারণ কী! সমাজে এই যে এত অনাচার, অত্যাচার, অসংগতি, সুদ, ধর্ষণ, বলাৎকার, জুয়া এসব নিয়ে তো তাদেরকে কখনো কোনো উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি। তাহলে নৌকাবাইচের মতো একটা নিরীহ বিনোদন নিয়ে এত সোচ্চার হওয়ার কারণ কী?

প্রতিদিনই খবরের কাগজ খুললে দেখা যায় কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ খুন হচ্ছে। ধর্ষণ, বলাৎকার তো রীতিমতো নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে; এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসার মতো পবিত্র জায়গাও এসব থেকে মুক্ত থাকছে না। এই তো কিছুদিন আগে নেত্রকোনার মদনে এক মাদ্রাসা হুজুরের ধর্ষণে তারই ছাত্রী ১১ বছরের এক শিশু অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। বিষয়টি প্রকাশিত হলে শুরুতে অনেকেই তার পক্ষাবলম্বন করে এটিকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এরই মধ্যে ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয়েছে শিশুটির গর্ভে সন্তান। এছাড়াও আরো অনেক জায়গা থেকেই ধর্ষণ, বলাৎকারের কথা শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অনেকেই হাতেনাতে ধরাও পড়ছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় দেশে যেন ধর্ষণ ও বলাৎকারের মহোৎসব চলছে। কিন্তু এসব নিয়ে আমাদের এসব জনতার কোনো মাথাব্যথা লক্ষ করা যায় না; তাদের যত মাথাব্যথা গানবাজনা, আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি নিয়ে। গত ১৯ আগস্ট, কিশোরগঞ্জে ব্যান্ড অ্যাশেজের কনসার্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় কিছু তথাকথিত ‘ইমাম-উলামা ও ধর্মীয়’ নেতারা এটিকে ‘ইসলামি শরিয়াহবিরোধী’ উল্লেখ করে তা বন্ধ করার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। জেলা প্রশাসনও সুবোধ বালকের মতো তাদের কথামতো অনুষ্ঠান বন্ধ করে জেলাকে পবিত্র রাখার মহান কাজটি সম্পন্ন করতে কসুর করেনি।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে মাদ্রাসা ছাত্রদের হামলায় পণ্ড হয়ে গেছে পুলিশ লাইনসের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জানা যায়, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির আগমন উপলক্ষ্যে রাতের বেলা পুলিশ লাইনসে জেলা পুলিশের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। এতে গানের শব্দ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুলিশ লাইনসের পাশের এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের বাদানুবাদ শুরু হয়। একপর্যায়ে শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসের ভেতরে ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ফলে অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। এ দেশের ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অফিস অঙ্গনে ঢুকে এমন ঘটনা অতীতে কখনোই ঘটেনি।

আজকাল যে কোনো তুচ্ছ অজুহাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটনায় অনুষ্ঠানে গানের উচ্চ শব্দকে দায়ী করা হচ্ছে, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিকে নিছক একটি বাহানা ছাড়া অন্যকিছু ভাবার অবকাশ নেই। কারণ উচ্চ শব্দে মাইক সর্বত্রই বাজছে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় জনসভায় কয়েক গ্রামের মানুষকে সারা রাত জাগিয়ে রেখে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো আজকাল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তখন তো কোনো প্রতিবাদ হয় না! প্রকৃত দ্বন্দ্বটা আসলে সংস্কৃতির মানুষের স্বাভাবিক এবং সহজিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে মৌলবাদের সংস্কৃতির চিরকালের সংঘাত। কেউ কেউ এর মধ্যে ধর্মকে টেনে এনে একটা কৃত্রিম সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়, যার পেছনে কাজ করে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক স্বার্থ। এ দেশে হাজার বছর ধরে ধর্ম আর সাধারণ মানুষের সহজিয়া সংস্কৃতি পাশাপাশি বিরাজ করছে, কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মানুষ সহজ মানুষের সহজিয়া সংস্কৃতিকে ধর্মের বিপরীত পক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং উদ্দেশ্যটা যে রাজনৈতিক, তা বলাই বাহুল্য। নাহয় নৌকাবাইচের মতো একটা নিরীহ সাংস্কৃতিক কর্ম নিয়ে ‘তৌহিদী জনতা’র এত খেপে ওঠার কারণ কী; আর এর সঙ্গে ধর্মেরই-বা সম্পর্ক কোথায়? আসলে নৌকাবাইচ নিয়ে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আসল মাথাব্যথা হলো বাঙালির সহজাত ও সহজিয়া সংস্কৃতি নিয়ে। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, ওপরে যে কয়টি ঘটনার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও বিচ্ছিন্ন নয়। সব ঘটনাই এক সুতোয় গাঁথা। সেই সুতোটা হলো সংস্কৃতি। স্বাভাবিকভাবে সংস্কৃতির গতিমুখ সম্মুখগামী, কিন্তু এই সংস্কৃতি পশ্চাৎমুখী।

গানবাজনা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ধর্মবাদী তৌহিদী জনতার যে আগ্রাসী তৎপরতা, তা ঐ পশ্চাৎমুখী সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র যার ক্ষেত্র তথা বীজতলা প্রস্তুতের কাজটা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই। ৫৫ বছর পর তাতে চারা গজাতে শুরু করেছে। পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের যে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের পথ ধরে জন্ম নিয়েছিল একটা স্বাধীন দেশ সেই লড়াইয়ে যারা পরাজিত হয়েছিল, তারা পরাজিত হলেও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। নতুন করে তারা স্বাধীন দেশের বীজতলায় পশ্চাৎমুখী সংস্কৃতির চাষবাস শুরু করে সবার সামনেই অথচ সবার অলক্ষ্যে সবার গোচরে অথচ প্রায় গুপ্তভাবে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাতে যোগ হয় নতুন মাত্রা প্রবণতাটি পায় এক অপ্রতিরোধ্য গতি। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে একের পর এক জেলায় কখনো তৌহিদী জনতা, কখনো-বা আলেম-উলেমাদের হুমকির মুখে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিছুদিন আগেও যা ছিল বিক্ষিপ্ত ও ব্যতিক্রমী ঘটনা, তা এখন যেন একটি সংগঠিত, পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্নে পরিণত হচ্ছে। প্রশাসনের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা এই প্রবণতাকে আরো উৎসাহিত করছে বলেই মনে হয়। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে হুমকি বা চাপের মুখে আয়োজকরা নিজেরাই অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন, প্রশাসন কার্যকর কোনো সুরক্ষা দিতে পারছে না। সম্প্রতি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তো অনেক দিন ধরেই গান-বাজনা-সিনেমা বন্ধ’। তার এই বক্তব্য যে পরিস্থিতির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ বই আর কিছু নয়, তা তো বলাই বাহুল্য। প্রশাসনের এই আত্মসমর্পণ, নিষ্ক্রিয়তা বা আপসকামী মনোভাবই মূলত তৌহিদী প্রবণতাকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে। বিয়ানীবাজারের নৌকাবাইচ বন্ধের পাঁয়তারা তারই প্রকাশ মাত্র।

সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতির পরিচয়ের ভিত্তি। নৌকাবাইচ, বাউলগান, লোকজ উৎসব এসব শুধু বিনোদন নয়; এগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের প্রতীক। এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি এতে ব্যর্থ হয়, কিংবা এখনই দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তাহলে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক সত্তা, সেই সঙ্গে আমাদের জাতিসত্তাও যে ভবিষ্যতে গভীর অস্তিত্বসংকটে নিপতিত হবে, তাতে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই।

লেখক :সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক