বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকাঙ্খিত ট্রফি জয় কিংবা আকাশচুম্বী সাফল্যের পরও প্রতিটি খেলোয়াড়কে একদিন থামতে হয়। লিওনেল মেসিও আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় জানাবেন, তা সবারই জানা ছিল। তবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি যে এভাবে চলে আসবে, তা হয়তো অনেকেরই কল্পনার বাইরে ছিল। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তার মাধ্যমে আকাশী-সাদা জার্সির বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের ইতি টানলেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি বিদায়ী পোস্ট মনে হলেও এর প্রতিটি পরতে জড়িয়ে রয়েছে গভীর প্রতীকী তাৎপর্য, যা উন্মোচন করেছে দেশটির ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস।
অবসরবার্তার সঙ্গে মেসি একটি ছবি শেয়ার করেছেন, যাতে দেখা যায় একটি নোটপ্যাডের তিনটি ছেঁড়া পাতায় বড় হাতের অক্ষরে (ক্যাপিটাল লেটার) লেখা বিদায়ী বার্তা এবং পাশে রাখা একটি সোনালি রঙের কলম। মেসি জানিয়েছেন, গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র দুদিন পরই তিনি এই চিঠিটি লিখেছিলেন। পরবর্তীতে বাবাকে হারানোর পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চিঠির পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে কাটানো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
মেসির বিদায়ী চিঠির পাশে রাখা কলমটি সাধারণ কোনো লেখনী নয়। এটি বিখ্যাত ফ্যান্টাসি সিরিজ হ্যারি পটারের সোনালি প্রলেপযুক্ত অফিশিয়াল ধাতব কলম, যার ওপরের অংশে রয়েছে জেকে রাউলিংয়ের জনপ্রিয় চরিত্র হার্মিওনি গ্র্যাঞ্জারের ব্যবহৃত ‘টাইম-টার্নার’। কলমটির শীর্ষে বৃত্তাকার কাঠামোর মাঝে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র বালিঘড়ি এবং গায়ে কালো রঙে খোদাই করা ফ্র্যাঞ্চাইজিটির লোগো। মেসি ও তাঁর পুরো পরিবার এই সিরিজের একনিষ্ঠ ভক্ত।
হ্যারি পটারের কল্পকাহিনিতে ‘টাইম-টার্নার’ হলো পেছনের সময়ে ফিরে যাওয়ার এক জাদুকরি মাধ্যম। মেসি এমন একটি বিদায়পত্রের ওপর এটি রেখেছেন, যেখানে তিনি জাতীয় দলের হয়ে পার করা দীর্ঘ ২০ বছরের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। এই কলমটির উপস্থিতি যেন মেসির খেলোয়াড়ি জীবনের আত্মত্যাগ, একের পর এক পরাজয়, তীব্র সমালোচনা এবং হেরে যাওয়া ফাইনালগুলোর কঠিন সময় পার করে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সোনালি সময়ে ফিরে যাওয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
টিওয়াইসি স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসি কোনো আনুষ্ঠানিক প্যাড ব্যবহার না করে সপ্তাহের দিন ও তারিখ লেখার ঘর সংবলিত সাধারণ নোটবুকের তিনটি পাতা ছিঁড়ে নিজের বার্তাটি লিখেছেন। কালো কালিতে সরু টানে বড় হাতের অক্ষরে লেখা সেই পাতায় কিছু তাৎক্ষণিক কাটাছেঁড়া ও সংশোধনীর চিহ্নও স্পষ্ট। পাতাগুলো বাঁ দিক থেকে ডানে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা জাতীয় দলে তাঁর দীর্ঘ যাত্রার শেষ অধ্যায়কে ফুটিয়ে তোলে।
প্রথম পাতায় মেসি বিদায়ের সিদ্ধান্তের মানসিক ভার এবং নিজের সর্বস্ব নিংড়ে দেওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের জন্য তিনি সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এবং দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ক্লান্তিময় কিন্তু সুস্পষ্ট এই বক্তব্যে একটি যুগের সমাপ্তির ঘোষণা ছিল। দ্বিতীয় পাতায় তিনি গত দুই দশকে ভক্তদের ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি স্মরণ করেছেন তাঁর পরিবার, সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও টিম ম্যানেজমেন্টকে। আর তৃতীয় পাতায় বিদায়বার্তার সুর রূপ নেয় গভীর দেশপ্রেমে; যেখানে তিনি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান তাঁকে আর্জেন্টাইন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এবং শেষ করেন ‘এগিয়ে চলো আর্জেন্টিনা’ অনুপ্রেরণাদায়ী বাক্যে।
চিঠির পাশাপাশি প্রকাশিত ভিডিওটিতে উঠে এসেছে জাতীয় দলের হয়ে মেসির অভিষেক, বড় বড় টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতা, হৃদয়ভাঙা হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফি জয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো। লিখিত আবেগ ও দৃশ্যমান স্মৃতির মেলবন্ধনে তৈরি এই দুটি পোস্টের মধ্য দিয়ে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পূর্ণাঙ্গ ইতি টানলেন।