ঈদের দুপুরটা কেটেছে ভয়াবহ গরমের মধ্যে। সেদিন গরমের মাত্রা ছিল ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও ওপরে। গিয়েছিলাম গ্যালভেস্টোন কেমাহ্ বোর্ডওয়াকে। নদীর তীরের অপরূপ একটা আনন্দভুবন। কাঠের রোলার কোস্টারসহ নানান রকমের রাইড আর শীতল পানীয় ও খানাখাদ্যির বিপুল সমাহার এখানে। আছে বোট রাইডিং-এর চমত্কার ব্যবস্থা। প্রচুর গাঙচিল দলবেঁধে ওড়ে এখানে। বিশাল লম্বা জেটিতে দাঁড়িয়ে সাঁতরে বেড়ানো ছোট বড় নানান সাইজের মাছ দেখারও সুযোগ আছে। এক ঘণ্টাও থাকতে পারলাম না সেখানে। গরম এতোটাই! সেই কারণেই ক্লান্তিতে ধ্বস্ত ছিলাম। ভেবেছিলাম টানা একটা ঘুম দেব। ক্লান্তিতে বুজে আসছিল চোখের পাতা।
কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল বেড়ালবাচ্চাটার ডাকে। অন্ধকার দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে অবিরাম ডেকে যাচ্ছে সে আমাকে। কিন্তু ভেতরে আসছে না।
মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে দরোজায় ফেলতেই দেখলাম খুশি হয়ে উঠেছে কিটো। সে আমাকে চোখের ভাষায় ওর সঙ্গে লিভিংরুমে যেতে বলছে।
ওকে অনুসরণ করে গেলাম সেই ঘরে। সে তার চিরাচরিত গড়ান পদ্ধতিতে আমার পায়ের কাছে ডিগবাজি আর লুটোপুটি খেতে খেতে আড়মোড়া ভাঙতে থাকল। আমি অনেকক্ষণ ধরে ওর গলায় ঘাড়ে থুতনিতে পেটে আর পিঠে হাত ঘষে দিলাম। তারপর বললাম, একটু ঘুমাই? তুই ওপরে চলে যা।
আবারও শুয়ে পড়লাম।
ফের ঘুমঘুম অবস্থায় শুনি পাশের ঘরে কিটো সোফা-কার্পেট কিংবা চেয়ারে আঁচড়ে খামচে সমানে খসখসে একটা শব্দ তুলে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। অন্ধকারে এগিয়ে গিয়ে মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে ওর ওপর ফেললাম। সে ছুটে এল আমার কাছে কিন্তু গড়ান দিল না। দেখলাম ওর চোখেমুখে আনন্দটা নেই। মন খারাপ করে চলে গেল সে টেবিলের তলায়। ওখান থেকে উঁকি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে কি বুঝতে পেরেছে সকালেই আমি চলে যাচ্ছি! ওদের সিক্সথ সেন্স খুব প্রবল।
আবার এসে শুয়ে পড়লাম।
সময় গড়িয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর অন্ধকার দরোজায় আবার ওর উপস্থিতি। আবার ওর ডাকাডাকি। ফের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যায় আমার। মোবাইলের আলো না জ্বেলেই জিজ্ঞেস করি—কী রে ব্যাটা ঘুমুতে দিবি না আমাকে!
কিটো ডাকতেই থাকে।
বাধ্য হয়েই সাড়া দিতে হয় ওর ডাকে। উঠে গিয়ে ওর ওপর আলো ফেলি। অদ্ভুত চোখে তাকায় সে আমার দিকে। কিন্তু এবারও নো গড়াগড়ি। নো ডিগবাজি। নো আহ্লাদ। ওর দুই চোখে বেদনার ছায়া অভিমানের ছায়া টলমল করছে। আমি হাত বাড়িয়ে ওর মুখটা ধরি। আমার হাতটা শুঁকে লেজ দিয়ে একটা বাড়ি দিয়ে, মাথা ঘুরিয়ে আমার পায়ে একটা ঢুস মেরে খুব স্লো মোশনে সে চলে গেল টেবিলের নিচে। অনেক ডাকলাম। বেরুলোই না।
ইতিমধ্যে রাত তিনটে অতিক্রম করেছে ঘড়ির কাঁটা। আমার দু’চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু।
ফের ঘুমানোর চেষ্টা।
নাহ কিটো আর ডাকতে আসে না।
ও কি চলে গেছে ওপর তলায়?
কোনো শব্দ না করে পায়ে পায়ে লিভিংরুমে এসে মোবাইলের আলোতে দেখি আমার ঘরের দরোজার দিকে মুখ করে বসে রয়েছে সে।
একটু আদর করি।
আদরটা না নিয়েই উলটোদিকে হাঁটা দেয় সে।
আমার সঙ্গে অভিমানের ব্যাপারটা আমাকে ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিচ্ছে বেড়ালবাচ্চাটা!
মনটা এত খারাপ হলো!
আহা রে এই পৃথিবীতে ভালোবাসা কত্তো রকমেরই না হয়!
ছবি :সাবরিনা নদী