সারসংকট : চাই চাহিদা, সরবরাহ ও বণ্টনে সামঞ্জস্যতা

গতকাল ইত্তেফাকে সারসংকট লইয়া দুইটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে । প্রথম রিপোর্টটি হইল কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে কৃষকদের সড়ক অবরোধ করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন । পরে বিজিবি-পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়নের সহায়তায় সার বিতরণ করিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে প্রশাসন। দ্বিতীয়টি খবরটি হইল জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে সার-কীটনাশকের দাম চড়া । ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের সরকারি দাম যেইখানে ১ হাজার ৫০ টাকা (৫০ কেজির বস্তা), সেইখানে কালোবাজার হইতে নিতে হইতেছে ১ হাজার ৬০০ হইতে ১ হাজার ৭০০ টাকায় । ইহাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়া যাইবার আশঙ্কা করা হইতেছে, যাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উপর ।

প্রকৃতপক্ষে সার লইয়া দেশে বহুমুখী সংকট বিরাজমান । একদিকে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাইতেছে না, অন্যদিকে ডিলার কর্তৃক সারের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির ঘটনা ঘটিতেছে। আবার সার মিয়ানমারে পাচারও হইতেছে। সারের বিতরণ ব্যবস্থায় দেখা দিতেছে ত্রুটিবিচ্যুতি । তাহা ছাড়া ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির ন্যায় সার আমদানিও ব্যাহত হইতেছে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশ হইতে সার আমদানি করিয়া থাকি। কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সারের সেই সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। কোনো কোনো সার কারখানায় হামলা চালানো হইয়াছে। বিশেষ করিয়া, হরমুজ প্রণালি দিয়া সারভর্তি জাহাজ ঠিকমতো চলাচল করিতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে বিভিন্ন দেশ । রাশিয়া হইতেও সার আমদানি করা হয়। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সেইখান হইতেও সার আমদানি প্রত্যাশিতভাবে করা যাইতেছে না। ফলে আমন মৌসুমে এই সংকট কোনো রকমে সামাল দেওয়া গেলেও নভেম্বরে আসন্ন বোরো মৌসুমে সার লইয়া বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে । তাহার জন্য আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি কতটা রহিয়াছে তাহাই আজ বিবেচনা ও চিন্তার বিষয় ।

সম্প্রতি সময়মতো পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের সারের ডিলারের গুদাম ভাঙিয়া সার লইয়া যাওয়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়াছে । ইহার পুনরাবৃত্তি কাম্য নহে । সাধারণত ধান লাগানোর তিন সপ্তাহের মধ্যে সার দেওয়া লাগে। আবার ধান রোপণের পর হইতে শিষ আসার পূর্ব পর্যন্ত জমিতে কয়েক দফা সার দিতে হয় । তাই সময়মতো ও পর্যাপ্ত সার কৃষকদের নিকট পৌঁছানোটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডিলারদের কেহ কেহ দাবি করিতেছেন, আগামী নভেম্বরের আলু, পেঁয়াজ ও ভুট্টা চাষকে কেন্দ্র করিয়াও আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাইতেছে । তাহা ছাড়া লাইসেন্স ছাড়া সার ব্যবসায় এবং ভেজাল সার বিক্রি করাটাও একটি বড় সমস্যা ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবৎসরে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদা গিয়ে দাঁড়াইবে ৬৭ লক্ষ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। ইহা ছাড়া এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের সুষম সার), জিপসাম, জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, বোরন ও অ্যামোনিয়াম সালফেটের চাহিদা ৯ লক্ষ ২১ হাজার ৩০০ টন । এখন এই চাহিদা নির্ধারণ কি সঠিক এবং এই পরিমাণ সারের মজুত কি আমাদের রহিয়াছে? আমাদের মনে রাখিতে হইবে, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের সিংহভাগই আসে বোরো ধান হইতে । আবার সারা দেশে মোট ব্যবহৃত সারের প্রায় ৬০ শতাংশ একা বোরো মৌসুমেই দরকার হয় । তাই কৃষি উৎপাদন যাহাতে মুখ থুবড়াইয়া না পড়ে, সেই জন্য নভেম্বরের আগেই সারের সকল প্রকার সংকট কাটাইয়া উঠিতে হইবে । অবিলম্বে সক্রিয় করিতে হইবে জিলা- উপজেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটিকে। ডিলারদের সারের মজুত ও বিক্রির তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে টাঙাইয়া দিয়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করিতে হইবে। যেইখানে সার অতিরিক্ত আছে, সেইখান হইতে সারের ঘাটতি থাকা এলাকাগুলোতে অবিলম্বে পুনর্বণ্টন করা আবশ্যক। সারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করিতে অসাধু কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা উচিত কঠোর পদক্ষেপ ।