পৃথিবী কি কেবল শক্তিধরদের খেলাঘর?

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৫

যুদ্ধের অভিঘাত কখনো কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। গোলার শব্দ সীমান্ত পেরোয়, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসযজ্ঞ অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে, জ্বালানির সংকট খাদ্যশস্যের মূল্য বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তাহার বোঝা বহন করিতে হয় পৃথিবীর সর্বসাধারণ মানুষকেই। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক পালটাপালটি হামলার ঘটনাবলি আবারও সেই নির্মম সত্যটি আমাদের সামনে উপস্থিত করিয়াছে। শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ যখন নিজেদের নিরাপত্তা, প্রতিশোধ কিংবা কৌশলগত স্বার্থের হিসাব কষে, তখন সেই হিসাবের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় নিরস্ত্র জনগণকে। এমনকি গতকাল বুধবার একটি দেশের বিয়েবাড়িতেও অনুষ্ঠান চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্রের শার্পনেলের আঘাতে এক শিশুসহ পাঁচ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হইয়াছে। যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা হইল—কোনো পক্ষের ঘোষিত লক্ষ্য যদি সামরিক স্থাপনা হয়ও, ধ্বংসের পরিধি অনেক সময় তাহার সীমা মানে না। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকে আরো বড় সংঘাতের সম্ভাবনা। একটি হামলা আরেকটি হামলার অজুহাত হয়, প্রতিশোধ জন্ম দেয় পালটা প্রতিশোধের। এইভাবেই সংঘাত ক্রমে এমন এক ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে, যাহা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়।

সবচাইতে উদ্বেগের বিষয়, এই সংঘাতের প্রভাব যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সীমানা ছাড়াইয়া ইতিমধ্যে বৃহত্তর বিশ্ব অর্থনীতিকে স্পর্শ করিতেছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা সৃষ্টি হইলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তেলের দাম বাড়িলে তাহার অভিঘাত পড়ে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষিতে। সার উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে, সেচ ও কৃষিযন্ত্র পরিচালনার খরচ বাড়ে, খাদ্য পরিবহনের ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী হয়। অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন যেখানে জ্বলিতেছে, ক্ষুধার উত্তাপ তাহার বহু দূরেও অনুভূত হয়। এইখানেই প্রশ্ন—পৃথিবী কি কেবল শক্তিধরদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল? প্রায় ৮৪০ কোটির অধিক মানুষের এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ কেন বারবার এমন সিদ্ধান্তের পরিণতি বহন করিবে, যাহা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাহাদের কোনো অংশগ্রহণ নাই?

উত্তরটি সহজ নহে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মিলিয়া এমন এক বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণ করিয়াছে, যেইখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ প্রায়ই ক্ষমতার অলিন্দে পৌছায় না। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, কৌশলগত সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়। কিন্তু এইসব সিদ্ধান্তের অভিঘাত যখন বাজারে প্রতিফলিত হয়, তখন ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য আরো প্রকট হয়। সচ্ছল মানুষ বাড়তি ব্যয় সামলাইতে পারে, কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য ব্যয় সংকোচন মানে অনেক সময় একবেলা আহার কমাইয়া দেওয়া।

আরো ভয়াবহ হইল মানুষের অনুভূতি ক্রমশ ভোঁতা হইয়া যাওয়া। দূরদেশের একটি শিশুর মৃত্যু আমাদের কাছে যখন কেবল একটি সংবাদসংখ্যা, তখন যুদ্ধের মানবিক মূল্যও আমাদের কাছে ক্ৰমে অস্পষ্ট হইয়া পড়ে। নিহতের সংখ্যা বাড়ে, আহতের সংখ্যা বাড়ে—কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে যে প্রত্যেকটি মানুষ একটি পূর্ণ জীবন, একটি পরিবার ও একটি স্বপ্ন বহন করিতেছিল, তাহা আমরা ভুলিয়া যাই। সুতরাং, এই সংকটের সমাধান কেবল আরো অস্ত্র, আরো নিষেধাজ্ঞা কিংবা আরো শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে নাই। প্রয়োজন সংযম, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি কার্যকর সম্মান। প্রয়োজন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা, যেইখানে কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যুক্তি অন্য রাষ্ট্রের নিরস্ত্র মানুষের জীবনের চাইতে বড় হইয়া উঠিবে না।

পৃথিবী কোনো পরাশক্তির ব্যক্তিগত খেলাঘর নহে। ইহা ৮৪০ কোটির অধিক মানুষের অভিন্ন আবাস। সেই আবাসে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কয়েকটি ক্ষমতাকেন্দ্রে গৃহীত হইলেও তাহার অশ্রু ঝরে সর্বত্র। অতএব শক্তিধরদেরও মনে রাখিতে হইবে–মানচিত্রে সীমান্ত থাকিতে পারে, কিন্তু মানুষের বেদনার কোনো সীমান্ত নাই। যুদ্ধ জিতিয়া কোনো রাষ্ট্র হয়তো সাময়িক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করিতে পারে—কিন্তু মানবতার পরাজয়ের ভিতর কোনো বিজয়ই প্রকৃত বিজয় নহে।

ইত্তেফাক/এনএন