নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা

বিজ্ঞানের শত আবিষ্কারের মধ্যে বিস্ময়কর আবিষ্কার হলো বিদ্যুৎ। সভ্যতার বিকাশে বিদ্যুতের ব্যবহার মানবজীবনের বড় কৃতিত্ব। প্রাত্যহিক জীবনে এর বহুমুখী ব্যবহার অপরিহার্য। সময় ও পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলেই শক্তির প্রয়োজন হয়। এ শক্তিই আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গীভূত। আর বিদ্যুৎ থেকেই আমরা পেয়েছি সব শক্তি। যে কোনো উৎপাদনমূলক কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার আবশ্যক। বিদ্যুৎ আজ মানুষের হাতে বন্দি। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর মাইকেল ফ্যারাডে তার মত পেশ করে বলেছিলেন, ‘Electricity is itself a great power that could easily vibrate the whole universe.’

বিদ্যুৎবাতির বাংলাদেশে যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সোয়া শ বছর আগে, গাজীপুর জেলার ভাওয়াল পরগনার রাজবাড়িতে। ব্রিটিশ শাসিত পূর্ববঙ্গের প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ছিলেন ভাওয়াল পরগনার রাজা। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই তিনি প্রথম বিলাত থেকে আমদানি করা জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রাজবাড়ি আলোকিত করেন। তেল বা গ্যাস ছাড়া কোনো ‘অলৌকিক’ শক্তিতে বাতি জ্বলছে, এমন দৃশ্য নিঃসন্দেহে সেকালে আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে যোজন যোজন দূরত্বে থাকা ভাওয়ালবাসীর কাছে বিস্ময়বোধের উদ্রেক করেছিল।

লন্ডনের পরই তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর ও ভারতের রাজধানী কলকাতায় বিংশ শতাব্দী শুরুর পূর্বেই বিদ্যুতের আলোর দেখা মিললেও ঢাকায় বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে কয়েক বছর। ১৯০১ সালে প্রথম ঢাকার নবাব আহসানউল্লাহর বাসভবনে একটি জেনারেটর স্থাপন করা হয়। ঐ বছরের ৭ ডিসেম্বর বোল্টন নামে জনৈক ব্রিটিশ নাগরিক আহসান মঞ্জিলে সুইচ টিপে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহের সূচনা করেন। নবাব আহসানউল্লাহর অর্থানুকূল্যে অক্টাভিয়াস স্টিল নামক কোম্পানি তৎকালীন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক ও আহসান মঞ্জিলসহ পর্যায়ক্রমে ঢাকার কয়েকটি অভিজাত ভবনকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় এনেছিল। ১৯১৯ সালে ‘ডেভকো’ নামক ব্রিটিশ কোম্পানির মাধ্যমে ঢাকায় সীমিত আকারে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার প্রথম বাণিজ্যিক বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৩ সালে ঐ কোম্পানি ঢাকার পরীবাগে প্রায় ছয় মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ‘ধানমন্ডি পাওয়ার হাউজ’ নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ শুরু করে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অভিজাত বাসিন্দা ছিল এই বিদ্যুতের গ্রাহক।

বর্তমানে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চুলা দিনের বেশির ভাগ সময় জ্বলছে না। অন্যদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেশি। দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আমদানিনির্ভরতা মূলত এর জন্য দায়ী। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বারবার এসব কথা বললেও কোনো সরকার বিষয়টি নিয়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বিদ্যুৎ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ— প্রায় প্রতিটি খাতই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিদ্যুতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও বিদ্যুৎ খাতে এখন নতুন ধরনের সংকট দেখা দিচ্ছে। সমস্যা কেবল উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি নয়; জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো, বৈদেশিক জ্বালানি নির্ভরতা, আর্থিক চাপ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমিত ব্যবহার— সবকিছু মিলিয়ে সমস্যাটি বহুমাত্রিক।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত গ্রিডভিত্তিক স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরকারি খাত ১২ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট, যৌথ উদ্যোগ ৩ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট, বেসরকারি খাত ১০ হাজার ৮৫৩ মেগাওয়াট এবং আমদানি ২ হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট। ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই সর্বোচ্চ সরবরাহকৃত চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ কাগজে-কলমে উৎপাদনক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও বাস্তবে বিদ্যুৎ-সংকট দেখা দিতে পারে। এর কারণ হলো স্থাপিত ক্ষমতা আর যে কোনো সময় বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ এক বিষয় নয়। জ্বালানি না থাকলে, সঞ্চালন ব্যবস্থা সীমিত হলে কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা কমে গেলে স্থাপিত ক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যায় না।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার প্রথম কারণ হলো জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা। দ্বিতীয় সমস্যা হলো উৎপাদনক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য। তৃতীয় সমস্যা হলো সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেই তা ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায় না। উৎপাদনকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিড, গ্রিড থেকে উপকেন্দ্র এবং সেখান থেকে বিতরণ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে হয়। তাই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। বাংলাদেশের বিদ্যুৎনীতিতে ভবিষ্যতে শুধু ‘আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র’ নির্মাণের লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত— কম খরচে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ। নতুন কেন্দ্র অনুমোদনের আগে অন্তত পাঁচটি বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন— জ্বালানি কোথা থেকে আসবে, উৎপাদন খরচ কত, কেন্দ্রটির সম্ভাব্য ব্যবহারযোগ্যতা কত, গ্রিডে সেটি কীভাবে যুক্ত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ভোক্তার ওপর আর্থিক বোঝা কত হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ও কম দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে সংস্কার বা অবসরে নেওয়া উচিত। উচ্চ দক্ষতার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে তুলনামূলক কম জ্বালানি লাগবে।

সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে বড় সমাধান: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব দ্রুত বাড়াতে হবে। দেশের সীমিত জমির বাস্তবতা বিবেচনায় বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। SREDA (Sustainable and Renewable Energy Development Authority)-এর তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিল্পকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সরকারি ভবন, শপিং কমপ্লেক্স, আবাসিক ভবন এবং অন্যান্য বড় ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে সহজ অর্থায়ন ও প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। সরকার প্রধান অবশ্য ইতিমধ্যে আবাসিক ভবনে সোলার ব্যবহারকারীদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলেছেন। 

নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক নিজের ব্যবহারের অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। SREDA ইতিমধ্যে নেট মিটারিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণে কাজ করছে। তবে শুধু সৌরবিদ্যুৎ বাড়ালেই হবে না; দিনের বেলায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কীভাবে সন্ধ্যার চাহিদার সময় ব্যবহার করা হবে, তারও সমাধান দরকার। এক্ষেত্রে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা BESS (Battery Energy Storage Szstem) ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে শক্তি সংরক্ষণ প্রযুক্তি যুক্ত হলে দিনের অতিরিক্ত উৎপাদন সন্ধ্যার পিক সময়ে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ু, বায়োগ্যাস, বায়োমাস, পৌরবর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হলো জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করা। 

বাংলাদেশের কৃষিতে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী খাত। সৌরচালিত সেচব্যবস্থা বাড়ানো গেলে ডিজেল ও গ্রিড বিদ্যুতের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে সৌর সেচ প্রকল্পে শুধু পাম্প স্থাপন নয়- সেচের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষকের ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনাও থাকতে হবে। যেখানে সম্ভব, সৌর সেচের সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দক্ষ সেচপ্রযুক্তি যুক্ত করা উচিত। উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ আমদানি স্থায়ী সমাধান নয়, বরং কৌশলগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যকে কেবল সংকটের সময়ের বিকল্প হিসেবে না দেখে একটি regional power market-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে আমদানি যেন দেশীয় উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করে। বরং যেখানে আমদানি তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য, সেখানে তা ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব বহুমুখী উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি ক্রয়, বিদ্যুৎ আমদানি এবং কেন্দ্রগুলোর capacity payment-সবকিছুর স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিতে মূল্য, সক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা ও বাস্তব উৎপাদনের ওপর কঠোর নজরদারি থাকা দরকার। একই সঙ্গে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে cost-reflective pricing-এর দিকে যেতে হবে। 

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক