ক্রোধ থেকে করুণার পথে

মানুষেরা আমার কাছে প্রায়শই জানতে চান—রাগকে কীভাবে দমিয়ে রাখা যায়। কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, ‘কিছুতেই রাগবেন না’ বলে যারাই আপনাদের এ ধরনের উপদেশ দিয়ে থাকুন না কেন, তাতে কিছু এসে যায় না। কেননা তেমন পরিস্থিতি এলে আপনারা রাগবেনই। আবেগের নানা অবস্থাকেই তো আপনারা ক্রোধ, ঘৃণা, লালসা, করুণা কিংবা প্রেম বলে থাকেন—তা সে সামান্যই হোক বা প্রচণ্ড। আসলে এ সবই হলো একই প্রাণশক্তির নানা ধরনের প্রকাশ। বহু মানুষই কোনো এক প্রচণ্ড রাগের মুহূর্তটিকেই তাদের জীবনের চরমতম অভিজ্ঞতা বলে থাকেন। মানে কোথাও না কোথাও মানুষ তীব্রতাকেই চান। কিন্তু তারা জানেন না যে, কীভাবে তীব্র হতে হয়। হয় শারীরিক কাজের দ্বারা, নয়তো রাগের মধ্য দিয়ে বা যন্ত্রণার মাধ্যমেই তারা তীব্রতা অনুভব করতে পারেন।

হুবহু এই কারণেই মাদকদ্রব্য আর যৌনতা আজ দুনিয়া জুড়েই এত বড়ো একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেভাবেই হোক মানুষ এখন ওই চরম কিছুরই স্বাদ পেতে চান, অন্তত কয়েকটি মুহূর্তের জন্য হলেও। ওই তীব্রতা বা চরম কিছুই তাদের আকর্ষণ করে। কারণ মানুষ তো ঠিক তা-ই চাইছেন এবং এটাই তাকে এখনকার হাজারো বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারে। 

বহু মানুষেরই দুর্ভাগ্য হলো—তারা ভয়, রাগ বা ঘৃণাকেই জীবনের তীব্রতম পরিস্থিতি বলে জানেন। কিন্তু তাদের ভালোবাসা কখনো অত তীব্র হয় না, তাদের শান্তি কখনো অত তীব্র হয় না, এমনকি তাদের আনন্দও কখনো অত তীব্র হয় না—একমাত্র খারাপ অনুভূতিগুলোই তাদের কাছে তীব্রতম। তাই তারা সেইগুলোর থেকেই তীব্রতার শক্তিকে উপলব্ধি করতে চান। এ ব্যাপারে ক্রোধ হলো এক ভয়ঙ্কর তীব্রতা। এমনই তীব্রতা যে, নিজেকেও তা কষ্ট দেয়। এমনই তীব্রতা, কাউকে যা ভীষণ বিপদে ফেলে দিতে পারে, চারপাশের মানুষজনকে ধ্বংস করতে পারে, এমনকি নিজেকেও শেষ করতে পারে, নানা ভাবে ।      

এটা বুঝতে হবে, আপনি যে ধরনেরই মানুষ হয়ে থাকুন না কেন, এমনকি আপনি যদি কোনো অতি মানবও হন, বাইরের পৃথিবীকে আপনি কিছুতেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। তা সে আপনার কোনো সংস্থাই হোক, আপনার পরিবারই হোক, কিংবা এ বহির্বিশ্ব—বাইরের সবটুকু পরিস্থিতির ওপরে আপনার পুরোটা নিয়ন্ত্রণ কখনোই থাকবে না। কিন্তু এই আপনিই আপনার ভেতরের পরিস্থিতিকে সম্পূূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। শুধু যদি এক নির্দিষ্ট উপায়ে নিজের প্রাণশক্তির রূপান্তর ঘটাতে পারেন, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই তা করুণা ও প্রেমের পথে বদলে যাবে এবং তখন আর কাউকে আপনাদের নীতিশিক্ষা দিতে আসতে হবে না। আর এরপর এই প্রক্রিয়াটা ধীরে ধীরে যখন আরো এগোবে, তখন আপনি আত্ম-সচেতনতার একেবারে চূড়ায় উঠে, পৃথিবীর সবার সঙ্গেই এক আত্মিক বন্ধন অনুভব করতে পারবেন। শেষে আপনি যখন চারপাশের প্রত্যেকেরই এক অংশ হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করবেন, তখন আপনার নিজেকে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার কথা, বা কারোর ক্ষতি না করার কথা, বা কাউকে ধ্বংস না করার কথা আর কাউকে এসে বলে দিতে হবে না। আসলে উপলব্ধির দিক দিয়ে যখন আপনি সবকিছুরই অংশ হয়ে উঠবেন, একমাত্র তখনই আপনি কোনো ক্রোধ ছাড়াই সবরকম পরিস্থিতিকে সামাল দিতে পারবেন। আপনাদের যা করণীয়, তা-ই করুন। কিন্তু যদি তা রাগ ও ঘৃণার মধ্য দিয়ে করেন, তবে তার কানাকড়িও দাম নেই—সে আপনি যা-ই করুন না কেন।              

যোগশাস্ত্রের সবটুকু এই তত্ত্বের ওপরেই গড়ে উঠেছে। এমন একটা দিন আসবে, যখন এই আপনাকেই যদি জটিলতম কোনো পরিস্থিতির সামনেও ফেলে দেওয়া হয়, দেখবেন, আপনার প্রাণশক্তি খুব শান্ত রয়েছে। দেখবেন, তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে আপনি কেমন একে একে বিচার করে নিচ্ছেন পরিস্থিতিটার গুরুত্ব কতটা, আপনি কে এবং আপনার এখতিয়ার কতখানি, আপনার সামর্থ্য ও ক্ষমতাই বা ঠিক কতটুকু। আসলে আপনি যখনই একাত্ম হয়ে প্রাণ ঢেলে কোনো কাজ করেন, তখন আপনি আত্মপরিচয় ভুলেই তা করেন। একমাত্র তখনই আপনি নিজের বুদ্ধিমত্তার দ্বারা চালিত হয়ে কাজ করতে পারেন। 

আসলে যোগের অর্থই হলো আপনার প্রাণশক্তিকে এমনভাবে উন্নত করা, যাতে তা ক্রমশই শরীরী সামর্থ্যের সীমানা পেরিয়ে, সচেতনতার এক সর্বোচ্চ উচ্চতায় আপনাকে তুলে ধরতে পারে। আর সেটাই হলো মানুষের সম্ভাবনার সম্পূর্ণ, সুন্দরতম বিকাশ।  

শেষে আপনি যখন চারপাশের প্রত্যেকেরই এক অংশ হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করবেন, তখন আপনাকে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার কথা, বা কারোর ক্ষতি না করার কথা, বা কাউকে ধ্বংস না করার কথা আর কাউকে এসে বলে দিতে হবে না।

n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন