পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিয়ে ম্যাক্স গ্রুপের পরিকল্পনা

টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা, কম খরচ ও সুরক্ষায় সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শক্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, জ্বালানির মূল্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেছে। এই বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিকল্প জ্বালানিই নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সারা বছরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সৌর বিকিরণ পেয়ে থাকে। দেশের বিস্তৃত শিল্পকারখানার ছাদ, বাণিজ্যিক ভবন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গুদাম, কৃষিজমি, জলাশয় এবং বিভিন্ন অনাবাদি স্থানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য বড় আকারের জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে রুফটপ সোলার একটি অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হতে পারে।

বাংলাদেশের রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসি ২০২৫ সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং গ্রিড-সংযুক্ত মেগাওয়াট-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ, রুফটপ সোলার, সৌরসেচ, সৌরচালিত পানি সরবরাহ, সৌর ইতি চার্জিং, ফ্লোটিং চার্জিং, ফ্লোটিং সোলার, solar mini/micro/nano/pico grid-সহ বিভিন্ন প্রযুক্তিকে নীতিমালার আওতায় এনেছে। নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে রুফটপ সোলারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সরকারি উদ্যোগের আওতায় দেশে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে নেট মিটারিং ব্যবস্থা সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক আকর্ষণ বাড়িয়েছে। নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫ অনুযায়ী, গ্রাহক নিজ প্রাঙ্গণে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করার পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে তার বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ পান।

সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে ম্যাক্স গ্রুপের পরিকল্পনা

বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের এই সুযোগকে সামনে রেখে ম্যাক্স গ্রুপ তার দীর্ঘদিনের পাওয়ার, ইঞ্জিনিয়ারিং, অবকাঠামো, নির্মাণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রূপান্তরিত জ্বালানি খাতে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন নয়; বরং গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত ক্লিন এনার্জি সলিউশন তৈরি করা।

এই পরিকল্পনার আওতায় সোলার ইপিসি, সোলার আইপিপি, CAPEX I OPEX/BOO/BOOT/PPA model, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, শিল্প ও বাণিজ্যিক রুফটপ সোলার, সৌরসেচ ও ওয়াটার পাম্পিং, সোলার স্ট্রিট লাইটিং, সোলার রিফ্রিজারেশন ও কোল্ড স্টোরেজ ও স্মার্ট মিনি হোম সোলার সলিউশন নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে শিল্পকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বড় বাণিজ্যিক ভবনের ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা ম্যাক্স গ্রুপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। CAPEX model-এর পাশাপাশি OPEX/BOOT model-এর মাধ্যমে এমন প্রতিষ্ঠানকেও সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে, যারা নিজেরা বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বা সক্ষম নয়।

এর পাশাপাশি সোলার পিভি-এর সঙ্গে BESS যুক্ত করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরো নির্ভরযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ শুধু দিনের সময়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সঠিকভাবে পরিকল্পিত স্টোরেজ সিস্টেমের মাধ্যমে ক্রিটিক্যাল লোড ম্যানেজমেন্ট, ব্যাকআপ পাওয়ার এবং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট এর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

সম্ভাবনা সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের পথে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, এ খাতে অর্থায়ন থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌর প্রকল্পের প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বেশি। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য CAPEX model-এ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। আবার OPEX model-এর ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ইপিসি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। গবেষণা ও শিল্প খাতের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে রুফটপ সোলার প্রকল্পে ঋণ দিতে সতর্ক থাকে এবং কোলেটারাল এবং ঋণ প্রক্রিয়াকরণের জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নকে ধীর করে।

দ্বিতীয়ত, গ্রিড ইন্টিগ্রেশন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। বড় পরিমাণ রুফটপ সোলার গ্রিডে যুক্ত হলে ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক, ট্রান্সফরমার, প্রোটেকশন সিস্টেম, মিটারিং এবং পাওয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট আরো উন্নত করা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে সোলারের intermittent nature মোকাবিলায় BESS উন্নত এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের প্রয়োজন বাড়বে। 

তৃতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সময়। বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন, সংযোগ, ইন্সপেকশন, মিটারিং এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ না হলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমতে পারে।

চতুর্থত, জমির প্রাপ্যতা। সোলার প্রজেক্টের জন্য জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ভবিষ্যতে রুফটপ সোলার, ফ্লোটিং সোলার, agrovoltaics এবং অব্যবহৃত জমির সমন্বিত ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পঞ্চমত, নাতির ধারাবাহিকতা bankability। দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরিত জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল নীতি, নির্ভরযোগ্য অফ-টেকার, স্বচ্ছ প্রকিউরমেন্ট ম্যাকানিজম এবং দীর্ঘমেয়াদি regulatory certainty চান। নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন বা প্রকল্পের bankability নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসি-২০২৫ আগের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। নীতিমালায় solar, wind, green hydrogen, floating solar, storage-সহ বিভিন্ন প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং রিনিউয়েবল এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক ও রেগুলেটরি ইনসেনটিভের কাঠামো রাখা হয়েছে। এছাড়া নেট মিটারিং গাইডলাইন-২০২৫ চালু হওয়া এবং SREDA-এর মাধ্যমে approved solar modules I standards-এর তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ হওয়া একটি ইতিবাচক দিক। ২০২৬ সালে রূপান্তরিত সৌরবিদ্যুতের জন্য আয়কর ছাড় সংক্রান্ত এসআরও জারি হয়েছে, যা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো সহায়ক করার একটি পদক্ষেপ। 

তবে প্রশ্ন হচ্ছে-নীতিমালা কি শুধু যথেষ্ট, নাকি কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করা হচ্ছে? এই বিষয়ে সরকারের উদ্দেশ্য অনুযায়ী এনবিআরকে পরিচ্ছন্ন পরিপত্র জারি করে তা সার্বিকভাবে ঝামেলাবিহীনভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

আমাদের দৃষ্টিতে, নীতিগত কাঠামো এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হলেও বাস্তবায়নকে আরো দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা প্রয়োজন। ২০৩০ সালের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের ৩০ শতাংশ রূপান্তরিত বিদ্যুৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু সরকারি অর্থায়ন যথেষ্ট হবে না। ব্যক্তি খাত, স্থানীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ লগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং EPC companies-কে সমন্বিতভাবে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ সবুজ অর্থায়ন দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন, predictable tariff এবং নেট মিটারিং ম্যাকানিজম শক্তিশালী গ্রিড অবকাঠামো এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ কাঠামো। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক বিশেষণেও একই ধরনের বিষয় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি উপযুক্ত ছাদকে একটি সম্ভাব্য পাওয়ার জেনারেশন এসেট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একটি শিল্পকারখানার ছাদ তার নিজস্ব বিদ্যুৎ বিল কমাতে পারে; একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, একটি হাসপাতাল ক্রিটিক্যাল লোডের জন্য সোলার ও স্টোরেজ ব্যবহার করতে পারে, একটি সরকারি ভবন নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে পারে। একইভাবে কৃষিতে সৌরসেচ এবং গ্রামীণ অঞ্চলে decentralized solar solutions জ্বালানি নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে।

ম্যাক্স গ্রুপ মনে করে, বাংলাদেশের ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশন সফল করতে হলে সরকার, ব্যক্তি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং ভোক্তা এই পাঁচ পক্ষের সমন্বিত অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ হলো জ্বালানিসংকটকে শুধু একটি সমস্যা হিসেবে না দেখে এটিকে একটি ক্লিন এনার্জি ট্রান্সফরমেশনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।

সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য শুধু পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যম নয়, এটি হতে পারে জ্বালানিনিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। সরকার ইতিমধ্যে একটি নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এখন প্রয়োজন সেই লক্ষ্যকে দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা।

ম্যাক্স গ্রুপের লক্ষ্য দেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরে একটি দায়িত্বশীল ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে কাজ করা; এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, যেখানে সূর্যের শক্তি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে না, বরং শিল্প, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে আরো টেকসই করে তুলবে।

‘সূর্যের শক্তিতে বিদ্যুৎ, সাশ্রয়ী শক্তিতে শিল্প, পরিচ্ছন্ন শক্তিতে বাংলাদেশ।’

লেখক: চেয়ারম্যান, ম্যাক্স গ্রুপ