মাদক-হতাশা ও সুস্থ বিনোদনের অভাবই বাড়াচ্ছে অপরাধ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, সাইবার অপরাধ এবং পারিবারিক নৃশংসতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সর্বত্রই এখন এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও বিশেষ তত্পরতা সত্ত্বেও অপরাধের এই গ্রাফ কিছুতেই নিচে নামানো যাচ্ছে না। মাদকের অবাধ বিস্তারের সঙ্গে আছে নানা ধরনের হতাশা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ বিনোদনের অভাবেও অনেক তরুণ বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে।

খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধের সব সূচকই এখন ঊর্ধ্বমুখী। সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী এবং মনস্তাত্ত্বিকদের মতে—বর্তমান পরিবর্তিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কারণে অপরাধ পরিস্থিতি এখন ঊর্ধ্বমুখী। পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও মত তাদের। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা নামবিও বলছে—দক্ষিণ এশিয়ায় অপরাধ ইনডেক্সে আফগানিস্তারের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

অপরাধ নিয়ে গবেষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। বৈধ আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেকেই অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছেন। কর্মসংস্থানের চরম অভাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে বিপুল সংখ্যক যুবক হন্যে হয়ে ঘুরেও চাকরি পাচ্ছে না। এই তীব্র অর্থনৈতিক হতাশা ও টিকে থাকার লড়াই অনেককে বাধ্য হয়ে বা সহজে দ্রুত টাকা আয়ের আশায় পেশাদার ছিনতাই, ডাকাতি, জালিয়াতি ও চুরির সিন্ডিকেটে যুক্ত করছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, পাড়া-মহল্লায় আধুনিক সব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আইস, ইয়াবা ও বিভিন্ন মরণঘাতী মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আসক্ত তরুণরা পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে খুন বা ছিনতাইয়ের মতো মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব এবং সস্তা হিরোইজম দেখানোর জন্য গড়ে উঠছে ‘কিশোর গ্যাং’। রাজনৈতিক ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এই কিশোররা অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় ব্যবহূত হচ্ছে, যা পাড়া-মহল্লার স্বাভাবিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগআইনের শাসন দুর্বল হওয়া এবং অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের আরো বেপারোয়া করে তুলছে। দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর চূড়ান্ত রায় আসতে বছরের পর বছর কেটে যায়। এই সুযোগে অপরাধীরা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে কিংবা সাক্ষীকে ভয় দেখিয়ে পার পেয়ে যায় এবং পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হয়। অপরাধীদের একটি  বড় অংশ রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। এর ফলে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাধারণ অপরাধীদের মনে আইন ভঙ্গের সাহস জোগাচ্ছে।

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ও অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির ব্যবহার পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজকে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটে দাঁড় করিয়েছে। ব্যস্ততা ও যৌথ পরিবারের ধারণা বিলুপ্ত হওয়ার কারণে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের দূরত্ব বাড়ছে। সন্তানরা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—সেই তদারকি থাকছে না। ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি, অনলাইন জুয়া, সহিংস গেম এবং অপরাধমূলক কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বদলে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাতারাতি তারকা হওয়ার সস্তা মোহ এবং সাইবার বুলিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সাইবার অপরাধের জন্ম হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক বৈষম্য, মনস্তাত্ত্বিক হতাশা ও অবৈধ ক্ষমতার প্রদর্শন সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আকাশচুম্বী বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হীনম্মন্যতার জন্ম দিচ্ছে। একদিকে এক শ্রেণির মানুষের বিলাসী জীবনযাপন ও কালো টাকার পাহাড়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের অমানুষিক সংগ্রাম—এই দৃশ্য তরুণদের মনে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব তৈরি করে। আইনকে তোয়াক্কা না করে পেশিশক্তি ও অবৈধ ক্ষমতার দাপট দেখানোর প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেকেই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে অপরাধের এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যাকাণ্ডের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের একই সময়ের (১ হাজার ৫৮৫টি খুন) তুলনায় ১২.২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১১টি খুনের মামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে। পুলিশের তথ্য মতে, এ বছরের এপ্রিল মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২ হাজার ১১টি মামলা হয়েছে, যা এর আগের মাস মার্চের (১ হাজার ৪৮৫টি) তুলনায় ৩৫.৪ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে সামগ্রিকভাবে চুরি ১২ শতাংশ, ছিনতাই ৩৭ শতাংশ এবং অপহরণের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার রেশ ২০২৬ সালেও কাটেনি। বরং আরো বেড়েছে বলে তথ্য মিলেছে।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা নামবিও-এর ২০২৬ সালের ক্রাইম ইনডেক্স অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরেই অপরাধের দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যার স্কোর ৬১.৬ পয়েন্ট। অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান বা বলপ্রয়োগ করে অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ নিচে নামানো সম্ভব নয়। এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। দেশে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের বড় সাহস জোগায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি হত্যা মামলার আসামি শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যায়। সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার নিশ্চিত এবং সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না দিলে এই অপরাধের জোয়ার থামানো সম্ভব নয়।