হাম ও হামের উপসর্গে দেশে মৃত্যু ১ হাজার ছাড়াল

দেশের ইতিহাসে সব রেকর্ড ভেঙে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার পার হয়েছে। গত আট বছর ধরে যেখানে বার্ষিক সংক্রমণ ৪০০-র নিচে এবং মৃত্যু প্রায় শূন্য ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রার ঠিক উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে এই ভুলে যাওয়া অসুখ এখন মহামারি রূপ নিয়েছে।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলার এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি। গত মার্চ মাস থেকে হাম বাড়তে শুরু করে ব্যাপকভাবে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এপ্রিল থেকে মে মাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান। কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পরে যায়।

গত সোমবার হামে মৃত্যুর সংখ্যা যখন হাজার ছুঁই ছুঁই, সেদিন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন, ‘হামে এত মৃত্যু আমার জানামতে এ দেশে আগে হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, এর শিকার হলো শিশুরা।’

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ মঙ্গলবার থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গে তিন শিশুর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে হামের শিশুমৃত্যুর সংখ্যা হলো ১ হাজার ২। এর মধ্যে উপসর্গে মারা গেছে ৯০২ জন আর হামে ১০০ জন।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৯ শিশু। আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৬৯। আর বুধবার পর্যন্ত দেশে উপসর্গ ও নিশ্চিত মিলিয়ে হাম রোগীর সংখ্যা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪।

বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী গণমাধ্যমকে জানান, এবার বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে হামে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এত হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড নেই। এটা নজিরবিহীন।

টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণে ঊর্ধ্বগতি

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।

২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

২০২০-২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।

জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত ৫ মে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে টিকা সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

টিকা দেওয়ার পর এত সংক্রমণ ও মৃত্যু নজিরবিহীন

এবার প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, টিকাদানের পর এত সংক্রমণ সত্যিই নজিরবিহীন। এতে বিপুলসংখ্যায় শিশু বিপদে পড়েছে। এখন ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সের শিশুদের টিকার ব্যবস্থা করতে হবে।