'তোমরা নিরাশ হইও না এবং দুঃখ করিও না'

মহান আল্লাহ-তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন 'আশরাফুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে। ইহা মানুষের জন্য এক অনন্য মর্যাদা, যাহা অন্য প্রাণিকূল হইতে তাহাকে পৃথক করিয়াছে; কিন্তু সভ্যতার ধারাবাহিক পথপরিক্রমায় মানুষ এই মর্যাদা কতটা ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে, সেই প্রশ্ন তালাশ করিয়া দেখিবার অবকাশ রহিয়াই যায়। কারণ, মানুষই এমন এক প্রাণী, যাহারা জ্ঞান-বিবেক ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হইবার পরও নিজের জীবন নিজেই শেষ করিবার সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারে।

বিভিন্ন সময় কতিপয় পশুপাখির আচরণগত পরিবর্তন দেখিয়া মনে হইত, তাহাদের মধ্যেও 'নিজেকে শেষ করিয়া দেওয়ার প্রবণতা' রহিয়াছে; কিন্তু আধুনিক গবেষণা দেখাইয়াছে, বিষয়টি এত সরল নহে। অত্যন্ত ক্ষুদ্র, লাজুক ও নিশাচর প্রাণী টারসিয়ার সম্পর্কে একসময় মনে করা হইত, তাহারা আত্মহত্যা করে। প্রকৃতপক্ষে প্রচণ্ড ভয়, বন্দিদশা কিংবা পরিবেশগত চাপে তাহাদের মধ্যে আত্মক্ষতিকর আচরণ দেখা দিতে পারে; কিন্তু ইহাকে মানুষের মতো 'সচেতন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত' বলিবার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নাই। একইভাবে তিমি, ডলফিন, শিম্পাঞ্জি, বানর, হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে অস্বাভাবিক বা আত্মক্ষতিকর আচরণ দেখা যায়, তথাপি তাহারা ইচ্ছাকৃতভাবে জীবন শেষ করিয়াছে-এমন অকাট্য প্রমাণ নাই।

প্রশ্ন হইল, মানুষের মনোজগতে ঠিক কী এমন ঘটে, যাহার কারণে নিজের মূল্যবান জীবনটিই নিজে হনন করিবার প্রবণতা তৈরি হয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার পিছনে একক কোনো কারণ থাকে না; বরং এই ক্ষেত্রে হতাশা, বিষণ্ণতা, পারিবারিক বিরোধ, সম্পর্কের টানাপড়েন, পরীক্ষার চাপ, বুলিং, একাকিত্ব, আর্থিক সংকট, বেকারত্বের আশঙ্কা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপসহ নানা বিষয় একত্রে কাজ করিতে পারে। পরিসংখ্যান বলিতেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি হইতে অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশ রেকর্ডে ১২ হাজার ৪৬৭টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হইয়াছে। এই হিসাবে ঐ সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ জন আত্মহত্যায় মারা গেছে। চলতি বৎসরও এই ধারাবাহিকতা থামিয়া নাই। তবে সাম্প্রতিক চিত্রটি গভীর উদ্বেগের। বাংলাদেশে ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যায় মারা গিয়াছে, যেইখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩১০। অর্থাৎ, এক বৎসরে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। উদ্বেগের বড় কারণ, ইহাদের মধ্যে স্কুলশিক্ষার্থীর সংখ্যাই সর্বাধিক।
এমতাবস্থায়, আত্মহত্যা মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উপর জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নাই। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এবং সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা হইয়াছে। বাংলাদেশেও এই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ হইতেও এই ব্যাপারে জোর তাগিদ রহিয়াছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের দাবি, আত্মহত্যা প্রতিরোধে আসল টনিক হইল 'মনের যত্ন' এবং কাউন্সেলিং।

আমাদের তরুণদের মাথায় রাখিতে হইবে যে, জীবনে হতাশা বা ব্যর্থতা আসিতে পারে, সম্পর্ক ভাঙিতে পারে, পরীক্ষায় ফল খারাপ হইতে পারে, অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে: কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান নিজের জীবনকে শেষ করিয়া দেওয়া নহে। একটি মুহূর্তের হতাশা কেন একটি পূর্ণ জীবনের সম্ভাবনাকে গ্রাস করিবে? পবিত্র আল-কুরআনে মহান আল্লাহ বলিয়াছেন, 'তোমরা নিরাশ হইও না এবং দুঃখ করিও না। যদি তোমরা মুমিন হও তাহা হইলে তোমরাই সফলকাম হইবে।'-সুরা আল ইমরান, ১৩৯। অতএব, হতাশা যতই গ্রাস করুক, জীবনের পথ যতই কঠিন হউক, আত্মহননের পথ কখনোই সমাধান নহে। জীবন মহান স্রষ্টার দেওয়া আমানত। যেই জীবন রক্ষা করিবার জন্য ইতর প্রাণীর মধ্যেও প্রবল সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করে, সেই জীবন জ্ঞান-বিবেকসম্পন্ন মানুষ নিজের হাতে কেন নষ্ট করিবে? কেনই-বা সৃষ্টিকর্তার অসন্তুষ্টির কারণ হইবে? আত্মহত্যা মহাপাপ। তাই হতাশার কাছে নহে-জীবনের কাছেই ফিরিয়া আসিতে হইবে।