রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) কৃষিশিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণে ২৫ বছর পূর্ণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর বয়স সিকি শতাব্দী হলেও, উপমহাদেশের কৃষিশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর শেকড় প্রায় ৮৮ বছরের পুরোনো। সময়ের পরিক্রমায় নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে হাজারো কৃষিবিদ তৈরি এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় অবিস্মরণীয় অবদান রেখে চলেছে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ।
তৎকালীন বাংলার খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার লক্ষ্যে ১৯৩৮ সালের ১১ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে শুরুতে ১০ জন মুসলিম ও ১০ জন হিন্দু শিক্ষার্থী নিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এই ২০ জনই উপমহাদেশের প্রথম কৃষিবিদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এর নাম হয় ‘ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ এবং ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার পর নাম বদলে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বিএআই)’।
দীর্ঘদিন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকার পর নিজস্ব একাডেমিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের জোর দাবি ওঠে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সরকারি গ্যাজেট প্রকাশের মাধ্যমে ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে এর নতুন যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি, কৃষি অর্থনীতি, এনিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং ফিশারিজ অনুষদে ৬ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য একাধিক আবাসিক হল, আধুনিক গ্রন্থাগার, উন্নত ল্যাবরেটরি ও সুবিশাল কেন্দ্রীয় গবেষণা মাঠের ব্যবস্থা রয়েছে।
কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে শেকৃবির গবেষকদের উদ্ভাবন দেশজুড়ে সর্বজনস্বীকৃত। উচ্চফলনশীল ধানের জাতের পাশাপাশি ‘সাউ স্মার্ট ড্রায়ার’, ‘স্মার্ট ফিডার’ ও ‘স্মার্ট এরেটর’-এর মতো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তারা। একই গাছে আলু ও টমেটো (পমেটো), ভিনদেশি সবজি ব্রাসেলস স্প্রাউট এবং প্রাণিদেহে অণুজীবঘটিত রোগ নিয়ে তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ‘কাজী পেয়ারা’র জনক ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা এ প্রতিষ্ঠানেরই গর্বিত সাবেক শিক্ষার্থী। কৃষিতে অসামান্য অবদানের জন্য এখানকার গবেষকরা স্বাধীনতা পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদকসহ বহু জাতীয় সম্মাননা অর্জন করেছেন।
অর্জনের পাশাপাশি ৬ হাজার শিক্ষার্থীর এই ক্যাম্পাসে বর্তমানে আবাসন, পরিবহন, শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতার মতো নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও স্মার্ট কৃষির যুগে গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন এখন সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ জানান, ২৫ বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে শেকৃবিকে আরও স্বচ্ছ ও গবেষণামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। শিক্ষক-জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে আগামী দিনে শেকৃবিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ কৃষি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই বর্তমান প্রশাসনের প্রধান প্রত্যাশা।