একসময় যেখানে ছিল ঘরবাড়ি, উঠান আর মানুষের কোলাহল, পায়রা নদীর অব্যাহত ভাঙনে সেই বাহেরচর গ্রাম এখন অস্তিত্ব সংকটে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে নতুন করে অন্তত ২০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এসব পরিবার এখন সরকারি রাস্তার ওপর কোনো রকমে মাথা গুঁজে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের চিত্র এখন এমনই। স্থানীয়দের দাবি, এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক পরিবার নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছে। অনেকে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আর যাদের যাওয়ার মতো জায়গা বা সামর্থ্য নেই, তারা বারবার নদীর পাড়েই নতুন করে ঘর বাঁধছেন। কোনো কোনো পরিবারকে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ঘর তুলতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যখন হারানোর মতো আর কোনো ভিটেমাটি থাকে না, তখন সরকারি রাস্তার পাশেই আশ্রয় নিতে হচ্ছে তাদের।
ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ৩২ নম্বর আংগারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টার, সিকদার বাড়ি জামে মসজিদ ও মোল্লা বাড়ি। ভাঙন অব্যাহত থাকলে অচিরেই বিদ্যালয়সহ দুটি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে বাহেরচর গ্রামে গিয়ে কথা হয় ভাঙনে সর্বস্ব হারানো নিটুলী রানীর সঙ্গে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত সাতবার নদীভাঙনে তার ভিটেমাটি হারিয়েছে। সর্বশেষ আশ্রয়টুকুও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে সরকারি রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
আক্ষেপ করে জাকির খান (৫০) বলেন, ‘কত মানুষ আইলো, কত কথা কইলাম, কামের কিছুই হইলো না। আমনেগো লগে কথা কইয়া হইবো কি? কেউ তো আমাগো দিকে চাইলো না।’
রিপন মাল (৩৭) বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাদের গ্রামটি নদীভাঙনের শিকার। তার বয়সেই পাঁচ-ছয়বার বসতঘর পরিবর্তন করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গ্রাম ছেড়ে বাজারে গিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে তাকে।
আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমাদের সাড়ে তিনশ একর জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। ১৯৭৭-৭৮ সালে নদীর অপর পাশে বাকেরগঞ্জের সঙ্গে নতুন চরে ৬০টি পরিবারের জন্য ৯০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাকেরগঞ্জের লোকজন জবরদখল করে রাখায় আমাদের কোনো পরিবারই সেই জমি পায়নি।’
ভুক্তভোগী বাদল চৌকিদার বলেন, ‘বারবার নদীভাঙনে আমাদের সহায়-সম্বল বলতে কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর বসবাস করতে হচ্ছে।’ দ্রুত তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তিনি।
আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহীন গাজী বলেন, পায়রা নদীর অব্যাহত ভাঙনে তার ওয়ার্ডটি বিলুপ্তির পথে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
আঙ্গারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাহেরচর গ্রামের অস্তিত্ব রক্ষা এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
দুমকী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।