ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এইচ জি ওয়েলস সতর্ক করিয়া বলিয়াছিলেন, 'যুদ্ধ শেষ না করিলে একদিন যুদ্ধই মানুষকে শেষ করিয়া দিবে।' কথাটি বহু পুরাতন বটে; কিন্তু আজিকার পৃথিবীতে ইহার চাইতে 'ধ্রুব সত্য' যেন আর কিছুই নাই। আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষ করিতেছি, এক যুদ্ধের আগুন নিভিবার পূর্বেই অন্য প্রান্তে জ্বলিয়া উঠিতেছে নূতন আগুন। ইউক্রেনের পর গাজা, তাহার পর ইরানকে কেন্দ্র করিয়া মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, আর সেই আগুনের আঁচ ছড়াইয়া পড়িতেছে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া, সৌদি আরবসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। এই দৃশ্য প্রশ্ন ছুড়িয়া দিতেছে, পৃথিবী কি তাহা হইলে ধীরে ধীরে এমন একটি যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হইতেছে, যাহার পরিণতি কাহারও নিয়ন্ত্রণে থাকিবে না?
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের তৎপরতায় বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরিয়া সৃষ্টি হইয়াছে নূতন উদ্বেগ। লোহিতসাগর ও সুয়েজ খালসংলগ্ন এই জলপথ বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি। হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার সহিত বাব আল-মানদেবেও যদি দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তাহা হইলে সেই অভিঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় আটকাইয়া থাকিবে না, বরং উহা ছড়াইয়া পড়িবে বিশ্বময়। ইহার কারণ, আজিকার পৃথিবী বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নহে। একটি প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হইলে অন্য প্রান্তে বাড়িয়া যায় পরিবহন ব্যয়। জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিলে বাড়িয়া যায় তৈলের মূল্য, আর তৈলের মূল্য বাড়িলে স্বভাবতই বাড়ে খাদ্য, পোশাক, ঔষধ হইতে শুরু করিয়া প্রায় সকল পণ্যের মূল্য। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, লোহিতসাগরের সংকটের সময় বহু জাহাজকে দীর্ঘতর সমুদ্রপথে আফ্রিকা ঘুরিয়া চলিতে হইয়াছে। ফলে সময় ও জ্বালানি ব্যয় দুই-ই বাড়িয়া গিয়াছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে এমন বিঘ্ন ঘটিলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মূল্যস্ফীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হইতে বাধ্য, যাহা আমরা বর্তমানে প্রত্যক্ষ করিতেছি।
তবে এই যুদ্ধের সবচাইতে নির্মম পরিহাস অন্যখানে! গভীরভাবে লক্ষ করিলে বোঝা যাইবে, যুদ্ধবিগ্রহের সিদ্ধান্ত লইয়া থাকে সর্বদা শক্তিধররা, অথচ তাহার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। বড় শক্তিগুলি অস্ত্রের হিসাব করে, আর দরিদ্র দেশের মানুষ চাল কিনিবে, নাকি সন্তানের ঔষধ-এই সকল হিসাব মিলাইতেই ক্লান্ত হইয়া পড়ে। যুদ্ধরত দেশসমূহ মুখে নিজেদের নিরাপত্তার কথা বলে; কিন্তু সেই যুদ্ধের অভিঘাতে যে কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা অনিরাপদ হইয়া পড়ে, সেই সম্পর্কে কিছুই বলে না। পরিস্থিতি আঁচ করিয়া উন্নত দেশসমূহ বিকল্প জ্বালানি উৎস, কৌশলগত মজুত, একাধিক সরবরাহ পথ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঝুঁকি কমাইবার চেষ্টা করে; কিন্তু সেই সকল দরিদ্র দেশ যাইবে কোথায়? মানুষের ভবিষ্যৎকে কেনই-বা এইভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফালাইয়া দেওয়া হইবে? বিশ্বনেতারা যেন এই সহজ সত্যটি বুঝিয়াও বুঝিতে চাহিতেছেন না। পরাশক্তিগুলি আজ উলটা নিজেদের প্রভাববলয় বাড়াইতে ব্যস্ত; আঞ্চলিক শক্তিগুলি ব্যস্ত স্ব-স্ব হিসাবনিকাশ মিলাইতে। এক পক্ষের বিপরীতে আরেক পক্ষ দাঁড়াইয়া যাইতেছে; নূতন জোট তৈরি হইতেছে, বাড়িতেছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং উত্তেজনা; কিন্তু এই হিসাবের খাতায় সাধারণ মানুষের জীবন, ক্ষুধা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের মূল্য কে লিখিবে?
অবস্থাদৃষ্টে সুস্পষ্ট, পৃথিবী সত্যিই আর যুদ্ধের ভার বহন করিতে পারিতেছে না। একদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও বেকারত্ব; অন্যদিকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ। আর এই সকল প্রবণতার ফলে শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় সংলাপ ও আপসের জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হইয়া পড়িতেছে। এই চিত্র প্রত্যক্ষ করিয়া সচেতন ও বিবেকবান ব্যক্তিরা চিন্তা করিতেছেন, মানুষের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করিবার পরিবর্তে আমরা কি উহাকে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করিতেছি কি না? একটি ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ হয়তো একটি ভূখণ্ডে ঘটে; কিন্তু তাহার অভিঘাত পৌঁছাইতে পারে হাজার মাইল দূরের বাজারে, বন্দরে, কারখানায় এবং সর্বোপরি দরিদ্র পরিবারের রান্নাঘর অবধি। অতএব, যুদ্ধে কে জিতিবে, ইহার চাইতে এখন অনিবার্য প্রশ্ন হইল, মানবসভ্যতা আদৌ জিতিবে তো?