বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাস পার হয়েছে। এই সময়ে প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য শতভাগ আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তা খুঁজে পেতে জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সরকারকে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যাদের আস্থাভাজন মনে করা হচ্ছে, তাদের কাঁধে গুরুত্বপূর্ণ তিন-চারটি দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একসঙ্গে এত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে এসব কর্মকর্তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার যাদের আস্থাভাজন মনে করছে না, তাদের হয় অগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে অথবা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, কাজের গতি এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এক ব্যক্তির হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকা মানে কোনো কাজই ঠিকভাবে না হওয়া।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের রদবদল চলমান প্রক্রিয়া। নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় তাদের মধ্য থেকে উপযুক্ত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা বাছাই নিয়েও তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এ অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিএনপির আগের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। বর্তমানে সচিব বা সমমর্যাদার ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক, যা মোট কর্মকর্তার প্রায় ২৯ শতাংশ। আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব কিংবা সমমর্যাদার পদে নিয়োগের জন্য নিয়মিত কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হলেও তাদের অনেকের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর ইতিবাচক, কিন্তু প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে, তাদেরও চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
তিন শতাধিক কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে :জনপ্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত তিন শতাধিক কর্মকর্তা তাদের মূল পদের পাশাপাশি অতিরিক্ত একাধিক পদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মকর্তা একসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এই মন্ত্রণালয়ের ২৫ জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈম একাই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগের (প্রশাসন ও অর্থ, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, মেডিক্যাল এবং আরএম অ্যান্ড পিআর ইউনিট) দায়িত্বে রয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ তিনটি অনুবিভাগের (নিরাপত্তা, বহিরাগমন ও রাজনৈতিক অনুবিভাগ), অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মাদ মফিজুর রহমান তিনটি অনুবিভাগ (অগ্নি, আইন ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন) এবং অতিরিক্ত সচিব কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শৃঙ্খলা অনুবিভাগের পাশাপাশি আনসার ও সীমান্ত অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আরেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান একসঙ্গে তিনটি অনুবিভাগে (ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার) দায়িত্ব পালন করছেন। একই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
এভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১৪ জন কর্মকর্তা, অর্থ বিভাগে ৯ জন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাত জন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ছয় জন, কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঁচ জন, স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঁচ জন এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে পাঁচ জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে রয়েছেন। একইভাবে যুগ্ম সচিব থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়েও অনেকে দুই থেকে চারটি করে অনুবিভাগ সামলাচ্ছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ শাখায় কর্মরত। ফলে একই কর্মকর্তাকে ভিন্ন প্রকৃতির দুটি দপ্তরের কার্যক্রম তদারকি করতে হচ্ছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যবস্থা চললে কাজের গতি কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় কর্মকর্তাদের ওপর মানসিক ও কাজের চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি বিঘ্নিত হচ্ছে ফাইলের গতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই শূন্যপদে দ্রুত পদায়ন এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সমাধান করা প্রয়োজন।
সাত শতাধিক কর্মকর্তা ওএসডি :সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের (প্রশাসন ক্যাডার) প্রায় সাত শতাধিক কর্মকর্তা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হয়ে আছেন। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে ওএসডি অথবা সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাদের নেই কোনো ডেস্ক, নেই বসার কোনো দপ্তর, কোনো শাখা বা উইংয়ের দায়িত্বও নেই। কিন্তু মাস শেষে বেতন-ভাতা ঠিকই পাচ্ছেন এসব কর্মকর্তা। বহাল আছে চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা সেই সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হচ্ছে অথবা ওএসডি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই ৩২ যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে বর্তমান সরকার। তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসকসহ (ডিসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদ ৮৯টি এবং অতিরিক্ত সচিবের পদ ২১২টি, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি, উপসচিবের ১ হাজার ৭৫০টি এবং সিনিয়র সহকারী সচিবের ১ হাজার ১৪৩টি পদ রয়েছে। এর বিপরীতে প্রশাসনে কর্মরত সচিব রয়েছেন ৮৩ জন এবং অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৩৫৩ জন, যুগ্ম সচিব ১ হাজার ২৬ জন, উপসচিব ১ হাজার ৪৮৫ জন ও সিনিয়র সহকারী সচিব ২ হাজার ১১৯ জন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে উপসচিব ছাড়া সব পদেই কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, প্রশাসনের মূল সমস্যা আমলারা নিজেরাই। তারাই তাদের অবস্থান (দলবাজি করে) নষ্ট করেছে। সব রাজনৈতিক সরকারই প্রশাসনে দলীয়করণ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয়করণ মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আমলাদের চরমভাবে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা অতিদলবাজি করেছে, তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া স্বাভাবিক। যারা দলবাজি কম করেছে, তাদেরকে অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করানো যেতে পারে। তবে কেউ যেন অন্যায়ভাবে প্রতিহিংসার শিকার না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দ ও রাজনৈতিক আদর্শের বাইরে কাউকে দায়িত্ব দেয় না। ফলে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি কিংবা কাজের গতি কমলেও সরকারের কিছু করার নেই। সরকার তো আস্থাভাজন কর্মকর্তা খুঁজবেই। এতে সরকারের কোনো দোষ দেখছি না।