এই বৎসর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও ভয়াবহতা কি ২০২৩ সালকেও ছাড়াইয়া যাইবে? যেই হারে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও তাহাতে মৃত্যুর সংবাদ আসিতেছে, তাহাতে এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। ২০২৩ সালে তিন লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০০-এর অধিক মানুষ। আর গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৫০ হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। চলতি বৎসর এই পর্যন্ত মৃত্যু হইয়াছে ১৪৩ জন। এমতাবস্থায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, সেপ্টেম্বরের শেষভাগ হইতে অক্টোবর জুড়িয়া পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, ডেঙ্গুর মূল মৌসুম এখনো শেষ হয় নাই-সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ সময়টা সামনেই আসিতেছে।
প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাংলাদেশের একটি সাংবাৎসরিক জাতীয় স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হইয়াছে। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, আগে জুলাই হইতে সেপ্টেম্বরকে এডিস মশার প্রধান প্রজননকাল ধরা হইত; কিন্তু এখন প্রায় সারা বৎসরই এই মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হইতেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হইল, একটা সময় ডেঙ্গুকে মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা মনে করা হইত; কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা বিভাগে সংক্রমণ সর্বোচ্চ হইলেও বরিশাল ও চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরেও আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক অধিক। বিগত কয়েক বছর ধরিয়া দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু শনাক্ত হইয়াছে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এডিস মশার বিস্তার ঘটিতেছে। ইহার পশ্চাতে রহিয়াছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশনের ত্রুটি, স্থির জলাশয়ের আধিক্য এবং সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। তাই সংক্রমণ চূড়ায় উঠিবার পূর্বেই মশক নিধন অভিযান ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি জোরদার করিতে হইবে।
উল্লেখ্য, পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার প্রজাতির মশা রহিয়াছে। ইহার মধ্যে মাত্র ১০০টির মতো প্রজাতি রোগ ছড়ায়। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গিয়াছে, মশা হইতে সকল মিলাইয়া ২০টির মতো রোগ ছড়ায়। তবে উদ্বেগজনক খবর হইল, পৃথিবীতে কীটপতঙ্গের আক্রমণে প্রতি বৎসর যত মানুষ মারা যায়, তাহাদের মধ্যে মশাবাহিত রোগে মারা যায় সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ। সাধারণত যুদ্ধেও এত লোক মারা যায় না। এই জন্য এই ছোট্ট পতঙ্গটির ব্যাপারে আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকিতে হইবে। ফগিংয়ের চাইতে জোর দিতে হইবে লার্ভিসাইডের উপর। ইহা ছাড়া মশা প্রতিরোধমূলক সরঞ্জাম ও ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা সুলভ ও সাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন। ইহা লইয়া উন্নত মানের গবেষণাও প্রয়োজন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তিন মাসব্যাপী সমগ্র দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধন করিয়াছেন। তাহার এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের কৌশলগত পরিবর্তনও প্রয়োজন। প্রথমত, শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করিয়া সমগ্র দেশে সমানভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করিতে হইবে। এই কাজে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করিতে হইবে। ইহা ছাড়া এডিস ও কিউলেক্স মশার জন্য পৃথক ও বৈজ্ঞানিকভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি, যাহাতে ভুল কীটনাশক প্রয়োগে সময় ও সম্পদের অপচয় না হয়। প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়িয়া তোলা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে এই কাজে উৎসাহিত করিতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা। তাহারা বাড়ি বাড়ি গিয়া মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকিতে সচেতন করিবেন। ব্যক্তিগত বাড়ির ছাদ, বারান্দা, রান্নাঘরের নিচে, ফ্রিজের নিচে, ফুলের টবে ও দুই বাড়ির মাঝের স্থানে যেইখানে পানি জমে; কিন্তু সরকারি বা সমাজকর্মীদের প্রবেশাধিকার নাই, সেইখানে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনায় উৎসাহিত করিবেন।
মোদ্দা কথা, অতীতের অভিজ্ঞতা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিয়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের সমন্বিত ও টিকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।