রাজনীতি থাকুক রাজনীতিবিদদের হাতেই

স্থানীয় শাসন কি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, নাকি সামাজিক প্রতিষ্ঠান? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সমিতি এই রকম প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠান কি একই চরিত্রের, নাকি ভিন্ন? উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখা হয়, তাহলে তাদের সঙ্গে স্থানীয় শাসনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ফারাক প্রচুর। ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন, যার পরিণতিতে দিল্লির নামমাত্র মোগল শাসনের পতন ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত হতে খোদ ব্রিটিশ সরকারের ভারতের শাসনভার গ্রহণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভূমি দাসে পরিণত করেছিল। ব্রিটিশরাজ ভারতের শাসনভার হাতে নিয়ে সেই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক শক্তির উন্মেষ প্রতিহত করতেই ১৮৬৪ ও ১৮৭০ সালে শহর ও গ্রামাঞ্চলে যে স্থানীয় শাসনব্যবস্থার সূচনা করে, তা ছিল মূলত রাজস্ব আদায় ও ব্রিটিশ শাসনকে দৃঢ় করার একটা কৌশল। সীমিত ভোটাধিকারে কতিপয় বশংবদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ রেখে ও অন্যদের মনোনয়নের মাধ্যমে সেই আদি স্থানীয় শাসন গঠিত হতো। যদিও সেই পরাধীন দেশেও স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টাগণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তারই প্রভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বগণ কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।

‘উদার গণতান্ত্রিক দর্শনের ধারক-বাহকগণ উদার গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যকর বিকাশের জন্য রাজনৈতিক শিক্ষা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সাম্য, স্থানীয় জবাবদিহি এবং জনসংবেদনশীলতার কারণে স্থানীয় সরকারের ওপর একধরনের অপরিহার্যতা আরোপ করেছেন' (স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, ১ম খণ্ড, প্রকাশ এপ্রিল ২০২৫, পৃষ্ঠা ৩২)। যখন আমরা কেউ বলি, আমাদের ঐতিহ্য নির্দলীয় স্থানীয় শাসন তখন আমরা প্রকৃতপক্ষে জাতীয় রাজনীতির একটি সুঠাম বিকাশেরই বিরোধিতা করি। সেই বাস্তবতা থেকে গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ ঘটাতে ১৯৭৮ সাল থেকে ভারতে পর্যায়ক্রমে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হয়। পাকিস্তান ২০১০ সালে বেলুচিস্তানে ও ২০১৩ সালে অন্যান্য প্রদেশে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে আংশিকভাবে অর্থাৎ স্থানীয় শাসনের মেয়র বা চেয়ারম্যান পদ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান করলেও সদস্যপদসমূহে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বজায় রাখে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন স্থানীয় শাসনে রাজনৈতিক প্রাধান্যের সাফাই গেয়েও ‘স্থানীয় শাসনের কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জন্য সংরক্ষিত প্রতীক বরাদ্দ না করার সুপারিশ' করে (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭)। এই সুপারিশের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় শাসনের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বন্ধ করার অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশগুলো বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যথাযথভাবে অনুমোদিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের আসন্ন স্থানীয় শাসন নির্বাচন নির্দলীয়ভাবেই হবে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ইচ্ছায় দলীয় প্রতীকে স্থানীয় শাসনে নির্বাচন শুরু হয়েছিল বলে নেতিবাচক প্রচার আছে। অথচ ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও বিএনপি দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে ও সাড়ে তিন শতাধিক চেয়ারম্যান পদ লাভ করে। ২০২০ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও 2021 এ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীর্ষ নিয়ে নির্বাচন করেছে। অন্যান্য সিটি করপেরেশনের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও বরিশাল সিটি করপোরেশনে ২০২৩ সালের ১২ই জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী দলীয় প্রতীক ‘হাতপাখা' নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এই সব নির্বাচনে নির্দলীয় প্রার্থীতার সুযোগ ছিল এবং কয়েক জন প্রার্থী নির্দলীয়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছিলেন। তেমনি ২০২০-এর ডিসেম্বর হতে ২০২১ এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীগণ দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং অন্তত হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ ও মাধবপুর, রাজশাহী জেলার পুঠিয়া, বগুড়া জেলার সান্তাহার, কাহালু, গাবতলী ও বগুড়া পৌরসভায় জয়লাভ করেন। বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণের আন্তরিক অবস্থান ছিল দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পক্ষে।

আমাদের দেশের কিছু সুশীল ব্যক্তির অবস্থান সব সময়ই রাজনীতির বিপক্ষে। তারা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও তার দায় রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার ফিকির খোঁজেন। রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের বিপক্ষে তারা সাধারণ নির্বাচনের সময় যেমন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা দেন তেমনি আওয়াজ তোলেন নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় শাসন নির্বাচনের। গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রধান নির্বাহী ‘দলনিরপেক্ষ স্থানীয় নির্বাচন কেন জরুরি' নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, 'দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কারণে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের মানে ব্যাপক ধস নামে'। ২০১৫ পরবর্তী সময়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধীদলসমূহ ব্যাপকভাবে নির্বাচন বর্জন করায় প্রার্থীর সংখ্যায় ধস নেমেছিল, আর তা স্বাভাবিকভাবে প্রার্থীদের মানেরও ধস নামাতে সহায়ক ছিল। নিবন্ধে তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, ‘গত সরকারের আমলে নির্বাচনব্যবস্থা নির্বাসনে চলে যাওয়ার কারণে যারা ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতেন, তারাই নির্বাচিত হতেন'। বর্তমানে নির্বাচনব্যবস্থা নির্বাসন থেকে ফেরত আসায় আগের মতো জুজুর ভয়ে ভীত হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। বরঞ্চ এখনকার এই উন্মুক্ত পরিবেশে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক দলসমূহ সাংগঠনিক ভিত্তি পরখ করার সুযোগ নিতে পারে। 'তথাকথিত মনোনয়ন-বাণিজ্য এবং পেশিশক্তির প্রভাব, যার ফলে কদাচ যোগ্য ব্যক্তিরা মনোনয়ন পেতেন' বলে একই নিবন্ধে ড. মজুমদার আক্ষেপ করেছেন। রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে প্রার্থী নির্বাচিত হলে সেই প্রার্থীর কার্যকলাপের সঙ্গে দলের মানমর্যাদা জড়িত থাকে বিধায় দল সচেতন থাকে। ফলে দল দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত ব্যক্তিদের ততটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যাতে পরবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা দলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেন। কিন্তু নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তির কৃতকর্মের জন্য কোনো দল দায় দায়িত্ব নেয় না। অন্যদিকে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত স্থানীয় শাসনের প্রতিনিধিগণের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়ে চলে যায়।

দলীয় প্রতীকে ড. মজুমদারের শঙ্কা মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে। অথচ 'মাঠপর্যায়ে দলের 'চেইন অব কমান্ড' ঠিক রাখতে বিএনপি একক প্রার্থীকে সমর্থনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান। নির্দলীয় প্রতীকের আড়ালে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করার পরিবর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করলে দলসমূহের জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার যাচাই হতে পারে। নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরানো বা মতের সঠিকতা ধরে রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো পেতে পারে জনগণের রায়। ভোটারের কাছে তৈরি হতে পারে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতার রেওয়াজ, এই ধারাবাহিকতায় রাজনীতি হবে অনেক পুরুষ্ট। তাতে করে দেশের রাজনীতি থাকবে রাজনীতিবিদদের হাতেই, বারংবার হোঁচট খেয়ে হবে না অরাজনীতিবিদদের মুঠোবন্দি। রাজনীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে রাজনীতিবিদদের হাতে রাখতে হলে অনেক শর্তের মধ্যে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় শাসনের প্রতিনিধি নির্বাচন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব