সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ব্যতীত উন্নতি সম্ভব নহে

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৪

কেহ কাজের চাপে পিষ্ট, কাহারো কাজই নাই— গতকাল ইত্তেফাকে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হইয়াছে। সেইখানে বলা হইয়াছে—বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পার হইয়াছে, এই সময়ে প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য শতভাগ আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তা খুঁজিয়া পাইতে সরকারকে জটিলতার মুখোমুখি হইতে হইতেছে। ফলে কোথাও একজন কর্মকর্তার কাঁধে চাপানো হইতেছে তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, আবার কোথাও কর্মকর্তারা কার্যত কোনো দায়িত্ব ছাড়াই ওএসডি অবস্থায় রহিয়াছেন। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হইয়াছে, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব হইতে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত তিন শতাধিক কর্মকর্তা মূল দায়িত্বের পাশাপাশি একাধিক দায়িত্ব পালন করিতেছেন। অন্যদিকে প্রশাসনের প্রায় সাত শতাধিক কর্মকর্তা ওএসডি হইয়া আছেন। এই বৈপরীত্য শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই নির্দেশ করে না, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনশক্তির যথাযথ ব্যবহারের প্রশ্নটিকেও সামনে আনে।

প্রশ্নটি তাই কেবল সরকারি প্রশাসনের নহে। দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একদল কর্মী কাজের চাপে প্রায় পিষ্ট হইয়া যান। তাহাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ এবং একাধিক দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকে। অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানের আরেক অংশের কর্মীর হাতে পর্যাপ্ত কাজ থাকে না। এই ব্যবস্থার সবচাইতে বড় অসংগতি হইল, কাজের পরিমাণের সহিত পারিশ্রমিকের কোনো সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। যিনি প্রচুর কাজ করেন এবং যাহার হাতে একাধিক দায়িত্ব, তিনি যেমন তাহার নির্ধারিত স্কেল অনুযায়ী বেতন পান, তেমনি যাহার কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে কম, তিনিও একই স্কেল অনুযায়ী বেতন পান। বেশি কাজ করিবার জন্য বেতন বাড়ে না, আবার কাজ কম করিবার জন্য বেতন কমেও না। এখানেই রহিয়াছে ব্যবস্থাপনার বা ম্যানেজমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একজন কর্মীর উপর অতিরিক্ত কাজ চাপাইয়া দেওয়া যেমন ভালো ব্যবস্থাপনার লক্ষণ নহে, তেমনি সক্ষম ও কর্মক্ষম কোনো কর্মীকে দীর্ঘদিন প্রায় নিষ্ক্রিয় রাখাও প্রতিষ্ঠানের জন্য অপচয়। অতিরিক্ত কাজের ভারে একজন কর্মীর কর্মদক্ষতা, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। তিনি যতই যোগ্য ও পরিশ্রমী হউন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকিয়া সকল সময় সর্বোচ্চ মানের কাজ করা তাহার পক্ষে সম্ভব নহে। আবার কোনো কর্মীকে কাজ না দিয়া বসাইয়া রাখার অর্থ হইল প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদকে অব্যবহৃত রাখা।

এই দুই প্রান্তের মাঝখানে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই ভালো ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কে কতটা কাজ করিতে সক্ষম, কাহার কী ধরনের দক্ষতা রহিয়াছে, কোথায় কত জন কর্মী প্রয়োজন এবং কোন কর্মীকে কোন দায়িত্ব দিলে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যাইবে—ম্যানেজমেন্টকে তাহা বুঝিতে হইবে। কেবল পদ, জ্যেষ্ঠতা কিংবা ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করিলে তাহা সামষ্টিক উন্নয়নকে মন্থর করিবে। এই জন্য প্রয়োজন হইবে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, কর্মদক্ষতার পরিমাপ এবং দায়িত্বের যৌক্তিক বণ্টন। রাজনৈতিক সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা থাকা স্বাভাবিক হইতে পারে; ; কিন্তু প্রশাসনের দক্ষতা ও রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রশ্নে যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন অপরিহার্য। এক জনকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়া অন্য জনকে ওএসডি করিয়া রাখিবার দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা কোনো সুস্থ প্রশাসনিক কাঠামোর পরিচয় হইতে পারে না। এতে একদিকে জনবল ব্যবহারে ভারসাম্য নষ্ট হয়, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও জবাবদিহি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সুতরাং সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা বেসরকারি—সকল প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনারই প্রয়োজন স্বচ্ছ চোখে কর্মীদের মূল্যায়ন করা এবং যোগ্যতা, প্রয়োজন ও কর্মদক্ষতা অনুযায়ী তাহাদের কাজে লাগানো। ভালো ম্যানেজমেন্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ইহাই। আর দক্ষ জনশক্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন টিকিয়া থাকিতে পারে না। একটি দেশও তাহার মানবসম্পদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাইতে না পারিলে কাঙ্ক্ষিত উন্নতিতে কখনোই পৌঁছাইতে পারিবে না।

ইত্তেফাক/এনএন