১১ বছর ধরে মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না অটোভ্যানচালক ইয়ার মাহমুদ

অটোভ্যানের হ্যান্ডেলে হাত রেখে প্রতিদিনের মতোই ছুটে চলেছেন ইয়ার মাহমুদ। কখনো সখীপুর, কখনো সাগরদিঘী, আবার কখনো কচুয়া-ভালুকা সড়ক—যেদিকে যাত্রী, সেদিকেই তার গন্তব্য। সংসারের চাকা সচল রাখতে প্রতিদিন রাস্তায় নামেন তিনি। অটোভ্যান চালিয়েই পরিশোধ করছেন বিদেশ যাওয়ার সময় করা ঋণ।

তবে তার অটোভ্যানে উঠলে এক শ্রেণির যাত্রীকে ভাড়া দিতে হয় না। মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন—যাদের তিনি ভালোবেসে বলেন ‘কোরআনের পাখি’, তাদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেন না ইয়ার মাহমুদ। বিনিময়ে চান শুধু একটি দোয়া।

সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের চোখে এমনই একটি দৃশ্য ধরা পড়ে। অটোভ্যানে এক মাদ্রাসাছাত্র গন্তব্যে পৌঁছে ভাড়া দিতে চাইলে টাকাটি নিতে অস্বীকৃতি জানান ইয়ার মাহমুদ। শিশুটির মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিয়ে শুধু বলেন, ‘আমাকে দোয়া করবেন।’

অন্যের চোখে হয়তো এটি সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্তু ইয়ার মাহমুদের কাছে এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিয়ত, বিশ্বাস ও জীবনের গভীর এক বেদনা।

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিয়াপাড়া-ঘোনারচালা এলাকার মো. হাসান আলীর ছেলে ইয়ার মাহমুদের বয়স ৪১ বছর। তার নিজের ছেলে মো. ইমন মিয়া স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।

২০১১ সাল। ইয়ার মাহমুদের ঘরে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। কিন্তু পৃথিবীর আলো দেখার কয়েক ঘণ্টা পরই শিশুটি মারা যায়। নবজাতক সন্তানকে হারানোর সেই বেদনা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

সন্তান হারানোর সেই মুহূর্তেই সৃষ্টিকর্তার কাছে একটি নিয়ত করেছিলেন ইয়ার মাহমুদ—আল্লাহ যদি তাকে আরেকটি পুত্রসন্তান দান করেন, তবে সেই সন্তানকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন। পাশাপাশি মাদ্রাসাছাত্র ও কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের সম্মান করার সিদ্ধান্তও নেন তিনি।

এরপর জীবিকার সন্ধানে ২০১৪ সালে ধারদেনা করে ইউরোপের গ্রিসে পাড়ি জমান ইয়ার মাহমুদ। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় মাত্র ১১ মাস পরই দেশে ফিরতে হয় তাকে। বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া সেই ঋণের বড় একটি অংশ এখনো পরিশোধ করতে পারেননি তিনি।

দেশে ফিরে ২০১৫ সালে একটি অটোভ্যান কিনে জীবিকার নতুন পথ বেছে নেন। সেই সময় থেকেই নিজের সেই নিয়তকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নেন তিনি।

২০১৫ সাল থেকে অটোভ্যানে মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ, মুফতি, ইমাম ও মুয়াজ্জিন উঠলে তাদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না ইয়ার মাহমুদ। তার অটোভ্যানের পেছনেও লিখে রেখেছেন— ‘কোরআনের পাখিদের জন্য ভাড়া ফ্রি।’

ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘আমার নবজাতক পুত্রসন্তান যখন মারা যায়, তখনই নিয়ত করেছি—আমি আজীবন মাদ্রাসাছাত্র, আলেম ও হাফেজদের সম্মান করব। সেই ভালোবাসা থেকেই ২০১৫ সাল থেকে অটোভ্যানে মাদ্রাসাছাত্র, আলেম, হাফেজ ও মুফতিদের ভাড়া নিই না।’

তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ জন মাদ্রাসাছাত্র, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে বিনা ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেন তিনি।

অথচ নিজের সংসারেও অভাব-অনটন আছে। বিদেশ যাওয়ার সময় করা ঋণের প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা এখনো তার ওপর রয়েছে। অটোভ্যান চালিয়ে সেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছেন প্রতিনিয়ত।

মাদ্রাসাছাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া না নিলে নিজের আয় কমে যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়ার মাহমুদের বিশ্বাসে ফুটে ওঠে ভিন্ন এক দর্শন।

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে দিচ্ছেন। এমনিতেই যদি ৫০০-৬০০ টাকা কামাই করি, মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া না নিলে মনে হয় ওই দিন আরও বেশি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মাদ্রাসার ছাত্র, কোরআনের পাখিদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া চাই না, আমি তাদের কাছ থেকে দোয়া চাই। মানুষের দোয়া থাকলে জীবনে সফলভাবে কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব। এটা লোক দেখানো কোনো কাজ নয়। নিজের ইচ্ছায়, আল্লাহকে খুশি করার জন্য এবং কোরআনের পাখিদের সম্মান করার জন্য আমি এটি করছি।’

ইয়ার মাহমুদের অটোভ্যানে নিয়মিত যাতায়াত করেন স্থানীয় ইমাম ও একটি মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ আইন উদ্দিন আল আজাদ। তার ভাষায়, ইয়ার মাহমুদ অত্যন্ত সুন্দর মনের মানুষ।

তিনি বলেন, ‘ইয়ার মাহমুদ ভাই খুব সুন্দর মনের মানুষ। এমন মহৎ কাজ করে তিনি কোরআনের পাখিদের সম্মানিত করেছেন।’

যাত্রী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আজকাল এমন মানুষ দেখাই যায় না। অনেকেই ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি কোরআনের পাখিদের, অর্থাৎ মাদ্রাসাছাত্রদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য শামসুল আলম বলেন, ইয়ার মাহমুদ অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কোরআনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের বিনা ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া তার মানবিকতার পরিচয়। এমন কাজ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

ইয়ার মাহমুদের বাবা হাসান আলীও ছেলের এমন নিঃস্বার্থ কাজে আনন্দ প্রকাশ করেন।

জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব ইয়ার মাহমুদের কাছে খুবই সরল। অটোভ্যান চালাবেন, ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করবেন, সংসার চালাবেন—আর যতদিন সামর্থ্য থাকবে, মাদ্রাসাছাত্র ও কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের সম্মান করে যাবেন।

কথা বলতে বলতে নিজের অটোভ্যানটির দিকে তাকিয়ে ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘মরার আগ পর্যন্ত আমি এই পেশায় থাকতে চাই এবং মাদ্রাসাছাত্র, কোরআনের পাখিদের এই সম্মান জানাতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।’