পদ্মায় মিলছে না রুপালি ইলিশ, জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা মানিকগঞ্জের জেলেরা

একসময় প্রমত্তা পদ্মায় জাল ফেললেই জেলেদের ডোল ভরে উঠত রুপালি ইলিশে। মৌসুমি হাওয়ায় নদীপাড়ের ঘাটগুলোতে বসত মাছ বেচাকেনার উৎসব। কিন্তু সেই সোনালি দিন এখন অনেকটাই স্মৃতি। পদ্মায় টানা জাল ফেলেও মিলছে না প্রত্যাশিত মাছ। এতে ইলিশ ধরে পরিবার চালানো জেলেদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। নৌকা চালানোর খরচ ও পরিশ্রমের তুলনায় আয় নামমাত্র হওয়ায় নদী ছেড়ে বিকল্প পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ পদ্মা ও যমুনার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পদ্মার ইলিশ ছিল স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে কয়েক বছর ধরে নদীতে মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় সেই জীবিকার মাধ্যমটিই এখন সংকটে পড়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য বিশ্লেষণেও পদ্মা নদীতে ইলিশ আহরণে ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে হয় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ আহরণে বড় ধরনের পতন হয়ে তা নেমে আসে মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চার বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন, যা প্রায় ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এক বছরের ব্যবধানেই ইলিশ আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

সরকারি পরিসংখ্যানে ইলিশের যে চিত্র উঠে এসেছে, নদীপাড়ের জেলেদের অভিজ্ঞতাতেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক হোসেন ব্যাপারী বলেন, শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজও করতে হচ্ছে তাকে। নদী আগের মতো গভীর না থাকায় মাছও আসছে না বলে মনে করেন তিনি।

একই কথা জানালেন ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লা। তাঁর ধারণা, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক নৌযান ও জাহাজের শব্দের কারণেও ইলিশ দূরে সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জীবিকার সংকটে পড়ে নৌকা-জাল বিক্রি করে রিকশা চালানো শুরু করেছেন দড়িকান্দি গ্রামের নিবন্ধিত জেলে লিটন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে ইলিশের বিচরণে সংকট তৈরি হয়েছে। সমুদ্র থেকে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়ার উদ্দেশ্যে ইলিশের আগমনের পথে নদীতে পলি জমে সৃষ্টি হওয়া ডুবোচর ও চর বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ছাড়া নদীর পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বর্জ্যের কারণে পানিদূষণ এবং নদীর স্বাভাবিক খাদ্যচক্র নষ্ট হওয়াও এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা।

এর পাশাপাশি কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজননচক্রও ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ সুরক্ষায় ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ১০৯টি মামলা করা হয়েছে, ৭০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং মোট ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা, জলযান চলাচল, দূষণ ও অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে। অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও অসচেতনতার কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। তবে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সুরক্ষায় সরকারি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।