বরগুনার টেংরাগিরি বনে গাছ কাটার মহোৎসব, প্রতিবাদ করলেই মামলার হুমকি!

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৩৬

উপকূলীয় সুরক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক ঢাল ও ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ নামে পরিচিত বরগুনার তালতলীর টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এখন প্রকাশ্যেই উজাড় হচ্ছে। 

অভিযোগ উঠেছে, অসাধু বন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে প্রতিনিয়ত কেটে নেওয়া হচ্ছে বনের শত শত মূল্যবান গাছ। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো স্থানীয়দের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। এমনকি সংবাদ প্রকাশ চেপে যেতে সাংবাদিকদের 'ম্যানেজ' করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৩ হাজার ৬৪৪ একরের এই সংরক্ষিত বনে বিট কার্যালয়ের ঠিক সামনেই এখন প্রকাশ্যে দিনদুপুরে চলে গাছ কাটা। নলবুনিয়া বিট কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা এবং 'শুভ সন্ধ্যা' সমুদ্র সৈকত পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, কেবল এক কিলোমিটারের মধ্যেই গত ৩-৪ দিনে অন্তত দুই শতাধিক গাছ কেটে নিয়ে গেছে পাচারকারীরা। প্রমাণের আলামত মোছাতে গাছের গোড়া ও শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হচ্ছে। কাটা কাঠ ট্রলারে তুলে নির্দ্বিধায় পাচার করা হচ্ছে নদীপথে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সবুজে ঘেরা তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যা দ্বিতীয় সুন্দরবন নামে পরিচিত। উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর এই নিরাপদ আবাসস্থলে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে অবৈধভাবে গাছ কাটার মহোৎসব। সম্প্রতি ছকিনা বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ের ঠিক সামনেই দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে গাছ কাটা হচ্ছে। গাছ কেটে তা ট্রলারে বেঁধে নির্দ্বিধায় নদীপথে পাচার করছে চক্রটি। একই চিত্র দেখা গেছে, নলবুনিয়া বিট কার্যালয় সংলগ্ন এলাকাতেও। 

পর্যটন কেন্দ্র ‘শুভ সন্ধ্যা’ সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে একের পর এক মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। চক্রটি রাতের আঁধারে যেমন কাঠ পাচার করছে, তেমনি অনেক গাছ কেটে বনের ভেতরেই ফেলে রাখছে সুবিধাজনক সময়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। শুধু গাছ কেটেই তারা ক্ষান্ত হচ্ছে না। চুরির আলামত ও প্রমাণ মুছে ফেলতে উপড়ে ফেলা হচ্ছে গাছের গোড়া ও শিকড়। এসময় শুধুমাত্র ‘শুভ সন্ধ্যা’ সমুদ্র সৈকত এলাকার প্রায় ১ কিলোমিটার বনে দেখা গেছে, গত ৩-৪ দিনের মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক বনের গাছ কেটে নিয়ে গেছে কয়েকটি পাচারকারি চক্র।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রিফাত ও বাবুল হাওলাদার জানান,চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখেও তারা কিছু বলতে পারছেন না। গাছ কাটার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই বন বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের উল্টো গাছ কাটার মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখাচ্ছেন। ফলে আতঙ্কে প্রতিবাদ করার সাহস হারাচ্ছেন । তারা আরও বলেন, সরকার এখন বৃক্ষরোপণ করছে কিন্তু বন বিভাগের সহযোগিতায় বৃক্ষ নিধন হচ্ছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ -এর তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন,টেংরাগিরি বনাঞ্চলটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাত থেকে উপকূলের মানুষদের রক্ষা করে। এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদ চরম দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়বে।

গাছ কাটার বিষয়ে বক্তব্য জানতে নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মোঃ শাওনের কাছে গেলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে চাননি। উল্টো সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।

বনের গাছ কাটার সত্যতা নিশ্চিত করেন বনবিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম। তিনি বলেন, “সরেজমিনে গিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছি। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এবিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন,বন উজাড়ের বিষয়টি বেশ কয়েকবার বন বিভাগকে সতর্ক করে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি