ঈদের ছুটি শেষে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে কর্মস্থলে ফেরা মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। গৌরীপুর রেল স্টেশন থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া প্রত্যকটি আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেনে ছিলো যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। ট্রেনের ভিতরে ঠাঁই না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা ছাদে ভ্রমণ করতে বাধ্য হন।
জানা গেছে এসব ট্রেনের কোন টিকেট কাউন্টারে মিলছে না। যাত্রীদের তুলনায় টিকেট কম থাকায় ১০দিন আগেই এসব টিকেট চলে গেছে কালোবাজারিদের হাতে। প্রতিটি টিকেট তিন/চারগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
গৌরীপুর জংশন হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় সকালে আন্তঃনগর হাওড় এক্সপ্রেস, রাতে আন্তঃনগর মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস, মহুয়া কমিউটার ট্রেন ও বলাকা কমিউটার ট্রেন। এছাড়া বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাতে ছেড়ে যায়। সবগুলো ট্রেনেই উপচে পড়া ভিড়।
এদিকে গৌরীপুর জংশনে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী উম্মে হাবিবা নুর তাবাসুম বলেন, 'টিকেট কাউন্টারে টিকেট নেই। একটি টিকেট বাইরের এক মুদি দোকান থেকে নিয়েছি ৩শ টাকায়।' গার্মেন্টকর্মী নুরে আক্তার বলেন, 'আমার কাছ থেকে ৩টি টিকেটের মূল্য নিয়েছে ১হাজার ২৫০টাকা। যা মূল্যের তিনগুণ বেশি।' তাদের অভিযোগ স্টেশন মাস্টার ও বুকিং সহকারীদের সহায়তায় সব টিকিট কালোবাজারিদের হাতে চলে গেছে।
এ প্রসঙ্গে স্টেশন মাস্টার আব্দুর রশিদ বলেন, 'ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের প্রচুর ভিড়। ১০দিন আগেই টিকেট ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গৌরীপুরে যাত্রীদের তুলনায় টিকেট অত্যন্ত কম।'
অপরদিকে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডেও টিকেটের জন্য যাত্রীদের ছিলো দীর্ঘ লাইন। সিএনজি ভাড়া দ্বিগুণ নেওয়া হচ্ছে। ৪০ টাকার ভাড়া এখন ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
টিকেট না থাকা ও ভিড়ের কারণে গৌরীপুর স্টেশন থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ৩টি আন্তঃনগর ট্রেনে যাত্রী ওঠাকে কেন্দ্র করে এমনকি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (১৭ আগস্ট) আন্তঃনগর হাওড় এক্সপ্রেসে যাত্রী ওঠাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। এ সময় এক যাত্রীর হাত কেটে যায়। স্টেশনে আসার আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রত্যেকটি কোচের দরোজা। ফলে যাত্রীদের ওঠা নিয়ে ট্রেনের স্টাফদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও যাত্রীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ ট্রেনের বাথরুমের চারপাশ, দু’বগির জয়েন্টপথ ও নামাজখানার কোচে ঠাঁই মিলে যাত্রীদের। এসব যাত্রীদের সঙ্গে স্টাফদের চুক্তিতে চলে আসা-যাওয়া। ট্রেনের একজন স্টাফের ভাষ্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক), 'বিনা বেতনে চাকরি আমাদের। এ আয় দিয়েই চলে জীবন।'
অপরদিকে শনিবার ছেড়ে যাওয়া আন্তঃনগর মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসেও যাত্রী ওঠাকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও টিকেট কালোবাজারীদের দখলে। দ্বি-গুণ, তিনগুণ দিয়ে নিতে হচ্ছে ট্রেনের টিকেট। এক টিকেট কালোবাজারীকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
এদিকে শুক্রবার রাতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃনগর বিজয় এক্সপ্রেসে অনুরূপ ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্দ যাত্রীদের হাতে কাপ্তাইয়ে কর্মরত নৌবাহিনীর নাবিক (সাদা পোশাকে থাকা) তাহমিদ আহমেদ লাঞ্চিত হন। এ সময় তার মুঠোফোন চুরির ঘটনা ঘটে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, ট্রেনের ‘ট’ নং কোচ ভিতর দিক থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাত্রীরা টিকেট নিয়ে ওঠার জন্য ডাক চিৎকার ও অনুনয়-বিনয় করলেও দরোজা খোলা হয়নি। এক পর্যায়ে যাত্রীরা জানালা দিয়ে ওঠার চেষ্টা চালায়। এতেও ব্যর্থ হওয়ায় ট্রেনের স্টাফ, কর্তব্যরত আনসারদের অনুরোধেও দরোজা খোলা হয়নি।
এ নিয়ে সেনাবাহিনীর সৈনিক ও নৌ বাহিনীর ছুটিতে আসা নাবিকদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ ঘটনায় গৌরীপুর রেলওয়ে ফাঁড়িতে নৌবাহিনীর নাবিক টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীর রইছ উল করিমের পুত্র তাহমিদ আহমেদ লিখিত অভিযোগ দেন। তিনি জানান, ওই বগিতে ছুটিতে আসা পোশাকবিহীন নৌবাহিনীর ৫জন নাবিক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫জন সৈনিক ছিলো। যাত্রীদের উঠতে তিনি বাঁধা দেননি। ভিতর দিক থেকে কে লক করে দিয়েছিলো তিনি তা জানেন না। এ নিয়েই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: মতলবে মাদরাসা ছাত্রের হত্যার ঘটনায় আটক ১, মস্তক উদ্ধার
গৌরীপুর রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ কার্ত্তিক চন্দ্র রায় ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ইত্তেফাক/নূহু