একাদশ শ্রেণির নকল বইয়ে সয়লাব হয়ে গেছে রাজধানীর পুস্তক বাজার। ভুলে ভরা এসব বই কিনে বিপাকে পড়ছেন লাখো শিক্ষার্থী। এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে রাজধানীর একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন শারমীন আক্তার। সম্প্রতি তিনি পাঠ্যপুস্তক কিনতে নীলক্ষেত আসেন। এর আগে মিরপুর-১০ নম্বর বাস স্ট্যান্ডের পাশের একটি দোকান থেকে একাদশ শ্রেণির আবশ্যক বাংলা (পদ্য ও গদ্য) ও বাংলা সহপাঠ বই কেনেন। কিন্তু তার অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে তার কেনা পাঠ্যবইয়ের ভেতরে অনেক অমিল দেখে নীলক্ষেতে এসেছেন আসল বই কিনতে। নীলক্ষেতে এসে নামিদামি পুস্তকের দোকান থেকে জানতে পারেন, একাদশের আসল বই এখনো বাজারে আসেনি। ছোট ছোট অনেক দোকানে যেসব বই বিক্রি হচ্ছে, তা নকল। নকল বইগুলোর মধ্যে এক বইয়ের সিলেবাসের সঙ্গে আরেক বইয়ের সিলেবাস থেকে অনেক অমিল।
জানা গেছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পাশ করা শিক্ষার্থীদের একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হচ্ছে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর। এই শ্রেণির বই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অনুমোদন ও সরকারকে রয়্যালিটি দিয়ে ছাপানো নির্দিষ্ট প্রকাশনীর কাছ থেকে কিনতে হয় শিক্ষার্থীদের। ইতিমধ্যে এনসিটিবি অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের তালিকা দেশের লাইব্রেরিগুলোতে পাঠিয়েছে বৈধ প্রকাশনীগুলো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের হাতে আসল বই পৌঁছানোর আগেই বাজার ছেয়ে গেছে প্রতারক চক্রের ছাপানো নকল বইয়ে। ফলে একদিকে শিক্ষার্থীরা নকল বই কিনে প্রতারিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব। এনসিটিবি থেকে জানা যায়, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বেনামি ছাপাখানার মাধ্যমে অবৈধভাবে এনসিটিবির অনুমোদিত বই প্রস্তুত করে বাজারজাত করে আসছে।
গোপন ছাপাখানায় অভিযান ও হামলার ঘটনা : গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর গুদারাঘাট সংলগ্ন ‘পানির ফ্যাক্টরির গলি'র একটি নামবিহীন ছাপাখানায় এনসিটিবির অনুমোদিত বই গোপনে ছাপা ও বাঁধাই করার তথ্য পাওয়া যায়।
ছাপাখানাটির মালিক মানিক মিয়া। অবৈধভাবে নকল বই ছাপানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তথ্য পেয়ে হাজারীবাগ থানার এসআই আশরাফ এবং বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত হন। তারা সরেজমিন দেখতে পান, এনসিটিবি অনুমোদিত সিলেবাসের বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকের বিপুল পরিমাণ ফর্মা ও কাভার বাঁধাইয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল অক্ষরপত্র প্রকাশনীর 'বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি' এবং হাসান বুক হাউজের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বই।
বই ছাপানোর অনুমতি দেখতে চাইলে পুলিশ ও প্রকাশকদের ওপর হামলা চালায় তারা। এর মধ্যে পুলিশ অবৈধ বই জব্দ তালিকা করতে গেলে ফয়সাল ও মাসুদ রানার নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একদল লোক ফের তাণ্ডব শুরু করে। তারা পুলিশ ও প্রকাশকদের গালিগালাজ করে ও মারমুখী আচরণ দেখায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা বই জব্দে বাধা দেয় এবং হাসান বুক হাউজের দুই প্রতিনিধির ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তাদের তীব্র বাধা ও হামলার মুখে পুলিশ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
এনসিটিবি ও প্রকাশকরা জানিয়েছে, ফয়সাল ও মাসুদ রানা বিগত সরকারের আমলেও একই ধরনের নকল বই তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিল। বর্তমানে তারা নিজেদের এ সরকারের সমর্থিত কর্মী হিসেবে জাহির করে নতুন এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে মাসুদ রানা এই ব্যবসা অবৈধভাবে নয়, বৈধভাবেই করছি বলে মন্তব্য করেন। ফয়সালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন। হাজারীবাগ থানার এসআই আশরাফ বলেন, 'অবৈধভাবে বই চাপানোর প্রেসে অভিযান চালাতে গিয়ে আমি ও আরো কয়েক জন হামলার শিকার হয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং এনসিটিবিকে জানানো হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩ সালের কপিরাইট আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রকৃত ও বৈধ প্রকাশকরা, যারা নিয়মিত সরকারকে রাজস্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একাদশ শ্রেণির অধিকাংশ বই এনসিটিবি ১২ ভাগ রয়্যালিটি নিয়ে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর মাধ্যমে বাজারজাত করে থাকে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব পায়। কিন্তু এসব বই অবৈধভাবে বাজারে বিক্রি হওয়ায় সরকার এখানে রয়্যালিটি হারাচ্ছে।