চারিদিকে অস্থিরতা: সকল কিছু কি ভাঙিয়া পড়িতেছে?

চারিদিকে অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা বাড়িয়া চলিয়াছে। গত কয়েক দিনের পত্রপত্রিকা পড়িয়া এই প্রশ্নটি স্বভাবতই উঠে : মানুষ এত অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছে কেন? জানি, ইহার উত্তরে বলা হইবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানসিক বৈকল্য, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত চাপ ইত্যাদির কথা; কিন্তু আমাদের সম্পূরক প্রশ্ন হইল, শুধু সাধারণ মানুষই কি অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছে? দেশে দেশে শাসকগণের মধ্যে কি কোনো অস্থিরতা দেখা যাইতেছে না? কী অনুন্নত, উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশ—বিভিন্ন দেশের শাসকদের কথাবার্তা, চালচলন ও আচার-আচরণ স্বাভাবিক বলিয়া মনে হইতেছে না। তাহাদের বেপরোয়া মনোভাবে কি আমরা কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজিয়া পাইতেছি না? বিশ্বের বিভিন্ন দেশই আজ অস্থির ও টালমাটাল। তাহাদের শাসকদের বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যে তাহার চাইতে অধিক অস্থিরতার ছাপ বিদ্যমান।

যুগে যুগে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থা যখন ভাঙিয়া পড়ে বা তাহা ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম হয়, তখন নূতন বিশ্বব্যবস্থা গড়িয়া না উঠা পর্যন্ত দেশে দেশে নানা চড়াই-উতরাই ও ভাঙাগড়া পরিলক্ষিত হয়। অনেকে মনে করেন বর্তমানে বিশ্বে যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলিতেছে! এবং ইহার চূড়ান্ত রূপ কোথায় গিয়া ঠেকিবে তাহা নিশ্চয়তা দিয়া কেহ বলিতে পারিতেছেন না। এমন পরিস্থিতির প্রভাব কি মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পড়িবে না? যখন কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট অন্য একটি দেশকে উড়াইয়া দেওয়ার কথা বলেন, এই একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও গায়ের জোরে অন্য দেশ দখলের হুমকি দেন, সাংবাদিকদের উপর নানা রকম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন, তখন অস্থিরতার পারদ বাড়িয়া যাওয়া কি স্বাভাবিক নহে? যখন ইউরোপের শাসকগণ বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে টিনজাত খাবার ও পানীয় জল মজুতের নির্দেশ দেন, হাসপাতালসমূহ আগেভাগে প্রস্তুত রাখিবার কথা বলেন, তখন ভয় ও আতঙ্ক ছড়াইয়া পড়িতে কি সময় লাগে? তাহাদের এইরূপ লাগামহীন হুমকি-ধমকি বা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ বিশ্বনিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কি বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করিতেছে না? দেশে দেশে সামরিক মহড়া আর প্রক্সিযোদ্ধাদের ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতায় কি তৈরি হইতেছে না নূতন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা? একটি দেশের প্রেসিডেন্ট তো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি দিয়া রাখিয়াছেন। আরেক প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি তাহার প্রতিবেশী দেশকে তাহাদের ‘প্রধান ও স্থায়ী শত্রু' হিসাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করিবার নির্দেশ দিয়াছেন। কী ভয়াবহ পদক্ষেপ! মধ্যপ্রাচ্যের একটি অঞ্চলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়ার পর সেইখানে পারমাণবিক বোমা ফেলিবার কথা বলা হইতেছে! তাহার প্রতিক্রিয়ায় বলা হইতেছে যে, হুমকিদাতাদের রাজধানী মিশাইয়া দেওয়া হইবে মাটির সহিত! দিকে দিকে একশ্রেণির শাসক এখন উন্মাদের ন্যায় আচরণ করিতেছেন। তাহার ফলে বিশ্ব জুড়িয়া বৃদ্ধি পাইতেছে সামরিক বাজেট। এশিয়া ও ইউরোপে বাড়িতেছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা। এই সকল উগ্র নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি তৈল এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলেও দেখা দিয়াছে অস্থিরতা।

অতএব, শাসকরা যেইখানে মাথা ঠান্ডা রাখিয়া চলিতে পারিতেছেন না, সেইখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে ধীরস্থির ও অবিচল থাকিবে? ডব্লিউ বি ইয়েটসের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতার নাম ‘দ্য সেকেন্ড কামিং' (The Second Coming)। ইহা বিশ্বসাহিত্যে অস্থিরতা ও সামাজিক পতনের উপর লেখা সবচাইতে বিখ্যাত ইংরেজি কবিতাগুলোর অন্যতম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ- পরবর্তী পৃথিবীর চরম বিশৃঙ্খলা ও অসহিষ্ণুতা লইয়া কবি লিখিলেন, যাহার বাংলা ভাবার্থ এই রকম : ‘সবকিছু ভেঙে পড়ছে, কেন্দ্র আর ধরে রাখতে পারছে না;/ জগতে নেমে এসেছে স্রেফ বিশৃঙ্খলা,/ রক্তে ভেসে যাওয়া জোয়ার ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র.../ সেরা মানুষের মাঝে কোনো বিশ্বাস নেই,/ আর নিকৃষ্টরা ভরা তীব্র উগ্রতায়।' স্বভাবতই ইহা প্রতীয়মান হয়—উগ্রতা, বিশৃঙ্খলা ও অবিশ্বাসের মধ্যে অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি না পাওয়াটাই যেন অস্বাভাবিক।