সোলার প্যানেল বিদ্যুৎসংকট মোকাবিলায় শক্তিশালী হাতিয়ার

সম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। Power Grid Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল কয়েক হাজার মেগাওয়াট। রাত ৯টায় চাহিদা ১৭ হাজার ১২৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৪৩৯ মেগাওয়াট; ঘাটতি ২ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। বেলা ৩টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। আগস্টেও দেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে। প্রতিবেদনে জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো—এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ কী?

আমরা কি শুধু নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাব? শুধু কয়লা, তেল ও LNG আমদানি করব? নাকি আমাদের মাথার ওপরে প্রতিদিন যে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদটি বিনা মূল্যে আলো ছড়াচ্ছে, সেই সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগাব?

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় সৌরবিদ্যুৎকে আর ‘বিকল্প’ হিসেবে দেখার সময় নেই। এটিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। সোলার প্যানেলকে অনেকে সহজভাবে 'সূর্যের আলো দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করার যন্ত্র' বলেন। কথাটি ঠিক, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে চমৎকার বিজ্ঞান। সোলার প্যানেলের ভেতরে থাকে অসংখ্য photovoltaic বা PV cell। এসব কোষ সাধারণত সেমিকন্ডাক্টর উপাদান, বিশেষ করে সিলিকন দিয়ে তৈরি। সূর্যের আলো প্যানেলের ওপর পড়লে আলোর ফোটন সেমিকন্ডাক্টরের ইলেকট্রনকে শক্তি দেয়। এর ফলে ইলেকট্রনের প্রবাহ সৃষ্টি হয় এবং উৎপন্ন হয় DC electricity বা সরাসরি বিদ্যুৎ। কিন্তু আমাদের বাড়ি, অফিস ও অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ হলো AC electricity।

তাই সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত DC বিদ্যুৎকে inverter-এর মাধ্যমে AC বিদ্যুতে রূ পান্তর করা হয়। তারপর সেই বিদ্যুৎ সরাসরি বাড়িতে ব্যবহার করা যায়, ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা যায়, অথবা অতিরিক্ত হলে বিদ্যুৎ গ্রিডে পাঠানো যায়। এখানেই আসে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ Net Metering ব্যবস্থা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সৌরসম্পদ কোথায়? আমাদের সবচেয়ে বড় সৌরসম্পদ আসলে মরুভূমির মতো কোনো বিশাল জমি নয়। আমাদের বাড়ির ছাদ। শিল্পকারখানার বিশাল ছাদগুলো তো একেকটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে। এতে কৃষিজমি নষ্ট হবে না, বড় বড় বন কাটতে হবে না, মানুষের বসতি সরাতে হবে না। SREDA-I বৃহৎ সৌর প্রকল্পের জন্য জমির সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে রুফটপ সোলারকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে। বিশ্ব ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুতের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

Intemational Energy Agency বা IEA-এর সর্বশেষ Global Energy Review অনুযায়ী—২০২৫ সালে বিশ্বে সৌর PV-এর নতুন স্থাপনা প্রথম বারের মতো ৬০০ GW অতিক্রম করেছে। বছরের শেষে বিশ্বের মোট সৌর PV সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮০০ GW-এ পৌঁছেছে। একই বছরে নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতার তিন-চতুর্থাংশের বেশি এসেছে সৌর PV থেকে।

চীন সৌরবিদ্যুৎ বিস্তারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। IEA-এর হিসাবে ২০২৫ সালে চীন একাই প্রায় ৩৭০ GW solar PV স্থাপন করেছে। চীন শুধু সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে না; সৌর প্যানেল, সেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বিশাল শিল্পও গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ তারা একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদক এবং সৌর প্রযুক্তির উৎপাদক হয়েছে।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতও সৌরবিদ্যুতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দেশটির installed solar capacity ছিল প্রায় ১৬৮ GW। এর মধ্যে grid connected rooftop solar-এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩২.৬ GW ভারতের ‘PM-Surya Ghar' কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫১ লাখের বেশি পরিবার rooftop solar সুবিধা পেয়েছে এবং প্রায় ১৯ লাখ পরিবার ইতিমধ্যে শূন্য বিদ্যুৎ বিল পাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দেশটির সরকারি তথ্য জানায়।

এখানে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো—সরকার শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে তাকায়নি; বাড়ির ছাদকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশ করেছে। তাহলে বাংলাদেশের মতো বেশি সূর্যালোক পাওয়া দেশে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?

তবে সোলার প্যানেলের সীমাবদ্ধতাও আছে। সোলারকে জাদুর কাঠি ভাবলে চলবে না। সূর্য রাতে থাকে না। মেঘলা দিনে উৎপাদন কমে যায়। ফলে সন্ধ্যার পর বা দীর্ঘ সময় সূর্যালোক না থাকলে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অন্য উৎস বা battery storage দরকার।

আরেকটি সমস্যা হলো – সোলার প্যানেল দুপুরে বেশি বিদ্যুৎ তৈরি করে, কিন্তু মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা সব সময় দুপুরে সর্বোচ্চ নয়।

তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশে শুধু 'আরো সোলার প্যানেল' নয়, দরকার Solar + Battery + Smart Grid + Efficient Transmission এই চারটির সমন্বয়।

বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য rooftop solar বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল মিল, সিরামিক কারখানা, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্প কিংবা বড় গুদামের বিশা ছাদ যদি সোলার প্যানেলে ঢেকে দেওয়া যায়, তাহলে দিনের বেলায় সেই প্রতিষ্ঠান নিজের বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সজেই উৎপাদন করতে পারবে। ফলে—বিদ্যুৎ বিল কমবে। গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। জ্বালানি আমদানির চাপ কমবে।

সরকারের প্রথম কাজ হলো একটি জাতীয় Rooftop Solar Mission গ্রহণ করা। লক্ষ্য হতে পারে—প্রতিটি সরকারি ভবন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, উপজেলা কমপ্লেক্স, বাজার ও শিল্পকারখানার ছাদ পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা। দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বল্পসুদের Solar Loan চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ শর্তে financing এবং tax incentive দেওয়া যেতে পারে।

সরকার নিজেই যদি শুরু করে? বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু সরকার সব করবে—এমন চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। সবাইকে অংশ নিতে হবে। সেই সঙ্গে গ্রামে হতে পারে আরো বড় পরিবর্তন।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ছোট ছোট solar mini-grid তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে জাতীয় গ্রিড পৌঁছাতে সমস্যা, সেখানে solar + battery + local distribution system দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। কৃষকের সেচপাম্প সৌরবিদ্যুতে চালানো যেতে পারে। গ্রামীণ বাজারের দোকান, ধানকল, ঠান্ডা সংরক্ষণাগার, দুধ সংরক্ষণকেন্দ্র—সবই সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যায়।
আরেকটি বড় সম্ভাবনা সোলার ইরিগেশন। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। সেচের জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর কৃষকের নির্ভরতা কমিয়ে solar irrigation-এর দিকে যাওয়া যেতে পারে। দিনের বেলায় যখন সূর্যের আলো থাকে, তখন সোলার পাম্প দিয়ে পানি তুলে reservoir-এ রাখা যায়। প্রয়োজনে সঞ্চিত পানি ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ সূর্যের আলোকে শুধু বিদ্যুৎ নয়, কৃষির জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।

সূর্যের জন্য কাউকে বিল দিতে হয় না।

কোনো LNG terminal বানাতে হয় না। গ্যাসের পাইপলাইন বসাতে হয় না। কয়লা আমদানি করতে হয় না। জাহাজে করে জ্বালানি আনতে হয় না। শুধু প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, সঠিক নীতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে হয়। ২০২৫ সালে বিশ্বে সৌর PV-এর মোট সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮০০ অ্যাড-এ পৌঁছেছে।

চীন শত শত গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করছে। ভারত ১৬৮ অ্যাডের বেশি solar capacity-তে পৌঁছেছে। জার্মানির প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন PV installation রয়েছে। আমরা তাহলে কেন পারব না?

সোলার প্যানেল এক দিনে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট দূর করবে না। কিন্তু আজ থেকেই যদি প্রতিটি উপযুক্ত ছাদ, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশ বানানো যায়, তাহলে আগামী দিনের বিদ্যুৎসংকট মোকাবিলায় এটি হতে পারে আমাদের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। আমাদের বিদ্যুৎ ভবিষ্যৎ শুধু বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়—আমাদের ভবিষ্যৎ হতে পারে আমাদের ছাদে। আর সেই ছাদের ওপরে প্রতিদিন সূর্য উঠছে। আমাদের কাজ শুধু সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়—সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগানো।

লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক