জ্বালানিসংকট ও সরকারের দায়

বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে, ঠিক সে সময়েই বাংলাদেশে ঘটেছে জ্বালানি তেলের মূল্যে ইতিহাসের সর্বোচ্চ উল্লম্ফন। গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন—এই চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই কার্যকর হয়েছে। নতুন এই মূল্যহারে প্রতি লিটার ডিজেল এখন ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে আগের দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। ঠিক যেদিন নতুন দাম কার্যকর হলো, সেদিন সকালেই সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস ও মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম গত ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পত্রিকার খবরমতে ২১ সেপ্টেম্বর সকালে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস এবং মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ব্যারেলে ২ দশমিক ১৫ ডলার বা ২ দশমিক ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে এসেছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন হ্রাসমান, সে সময়ে দেশীয় বাজারে এর দাম বাড়ানোর কী যুক্তি থাকতে পারে? যদিই-বা থাকে, তা কার স্বার্থে?

এ ব্যাপারে সরকারের ব্যাখ্যা— পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আর এই প্রেক্ষিতেই দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। সরকারের এই যুক্তি আংশিক সত্যি হলেও সম্পূর্ণ নয়। এ কথা ঠিক যে, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বড় লাফ দিয়েছিল, যার ফলে ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন দিন পরই, ১৭ সেপ্টেম্বর, সৌদি আরব ও ওমানের মাধ্যমে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে বাড়তি অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রস্তাবের খবরে সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা কমে যায় এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৪.৫৯ ডলারে নেমে আসে। ২০ সেপ্টেম্বর তা আরো কমে যায়। অর্থাৎ চিত্রটি এমন নয় যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম একটানা বেড়েই চলেছে আর বাংলাদেশ শুধু তারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। বরং সরকার এমন একসময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজার নিম্নমুখী। জনমনে তা-ই জিজ্ঞাসা, মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সত্যিই কি সাম্প্রতিকতম বৈশ্বিক বাজার-চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অদৃশ্য কারণ রয়েছে?

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-সহ বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অন্য সব দ্রব্যের ওপরও গিয়ে পড়বে, যার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষদের হিমশিম খেতে হবে। অন্যদিকে, সরকারি দলের লোকেরা বরাবরের মতোই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। বিএনপির মহাসচিব রুহুল কবির রিজভির মতে আমাদের দেশে অন্য দেশের তুলনায় নাকি জ্বালানি তেলের দাম অনেক কম। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী গোটা ব্যাপারটাকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জ্বালানি তেল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পাচার হওয়ার বড় ঝুঁকিতে থাকায় সরকারকে তেলের মূল্য সমন্বয় করতে (বাড়াতে) হয়েছে। এ যেন অনেকটা 'নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের' মতো।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক ও বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে মাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সমন্বয় করা হচ্ছে। ধারণাগতভাবে এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও বাস্তবে এর হিসাব-নিকাশ কতটা সময়োপযোগী উপাত্তের ভিত্তিতে হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। কোন নির্দিষ্ট সময়কালের গড়মূল্য ধরা হচ্ছে, বিনিময় হারের কোন তারিখের হিসাব নেওয়া হচ্ছে, শোধনাগার ও পরিবহন ব্যয়ের প্রকৃত উপাত্ত কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রজ্ঞাপনে থাকে না। ফলে ‘স্বয়ংক্রিয়' শব্দটি একটি প্রযুক্তিগত বৈধতার আবরণ তৈরি করলেও, জনগণের কাছে এটি সব সময়ই একটি ব্ল্যাকবক্স। কারণ, যে ব্যবস্থায় প্রশ্ন তোলার সুযোগ যত কম, সেই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক চাতুর্যের অবকাশ থাকে তত বেশি।

চাতুর্য যে শুধু মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রেই, এমন নয়; অর্থনীতির বয়ান তৈরির ক্ষেত্রেও চাতুর্যের প্রয়োজন পড়ে। আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য প্রসঙ্গ এলেই সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়শই আঞ্চলিক দেশসমূহের তুলনা টেনে আনা হয়। গত এপ্রিলে যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়, তখন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আর সব দেশ যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, বাংলাদেশ তখনো দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল। কিন্তু কথাটির মধ্যে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গিয়েছিল। এ কথা সত্য, সে সময়ে এ অঞ্চলের প্রায় সব দেশই তেলসংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছিল। পাকিস্তান তো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল; ভারত, আফগানিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও নেপালও দাম বাড়িয়েছিল। কিন্তু এই তুলনাটি একমুখী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি বদলালে এসব দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন ঘটে। জুন মাসের এক তুলনামূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে থাকায় পাকিস্তানে পেট্রোলের গড় দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১৩০ টাকা থেকে কমে ১০২ টাকার কাছাকাছি নেমে আসে, ভুটানে প্রায় ১১০ টাকা থেকে কমে ১০০ টাকায়, আর বাংলাদেশেও তখন সামান্য কমে দাম দাঁড়ায় প্রায় ১১২ টাকা। আসলে, সরকার যখন দাম বাড়াতে চায়, তখন প্রতিবেশী দেশের দাম-বৃদ্ধির উদাহরণ তুলে ধরে ‘আমরা এখনো কম বাড়িয়েছি' বলে যুক্তি দেয়। কিন্তু বিশ্ববাজার নিম্নমুখী হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মূল্যহ্রাসের সঙ্গে দেশীয় বাজারের সামঞ্জস্য রাখার ক্ষেত্রে একই তৎপরতা দেখা যায় না। এটি একধরনের রাজনৈতিক চাতুর্য, যেখানে আঞ্চলিক তুলনা একটি নীতিগত মানদণ্ড না হয়ে সুবিধাবাদী হাতিয়ারে পরিণত হয়।

এ প্রসঙ্গে, আরো একটা বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। সব সময়ই আমাদের দেশে নির্বাহী বিভাগের একক সিদ্ধান্তে মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর করা হয়। এর জন্য কখনো কোনো সংসদীয় বিতর্ক, কমিটি-পর্যালোচনা বা প্রকাশ্য গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয় না। অথচ এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা সাধারণ পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যসহ সবকিছুকে—এককথায় কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে সরাসরি প্রভাবিত করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে একটি নির্বাচিত সংসদ কার্যকর থাকা সত্ত্বেও এত বড় অর্থনৈতিক, এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সিদ্ধান্ত সংসদে না তুলে বারবারই শুধু প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি সুস্পষ্ট ঘাটতি নির্দেশ করে। জ্বালানি মূল্যনীতির মতো একটা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত তিনটি কাজ করা উচিত বলে অনেকেই মনে করেন : প্রথমত, সংসদে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে মূল্যনির্ধারণী সূত্র ও তার উপাত্ত পর্যালোচনা; দ্বিতীয়ত, দেশে ক্রিয়াশীল সব উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা; যাতে সিদ্ধান্তটি একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়; তৃতীয়ত, ভোক্তা ও পরিবহন খাতের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের মতামত নেওয়া। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিতে এই তিনটি ধাপের কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি বলেই সিদ্ধান্তটি জনগণের কাছে একতরফা ও অস্বচ্ছ মনে হচ্ছে। আসলে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ভুলে যান যে একটি সিদ্ধান্ত কেবল কারিগরি সূত্রে সঠিক হলেই যথেষ্ট নয়, তার রাজনৈতিক বৈধতাও থাকা দরকার। আর সেই বৈধতা আসে বিতর্ক ও অংশগ্রহণ থেকে, একতরফা প্রজ্ঞাপন থেকে নয়, হোক সেটা জ্বালানির দাম কিংবা অন্যকিছু। এখানেই একটা নির্বাচিত সরকারের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক দায়।

লেখক : সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট