‘এখন ডেঙ্গু বাড়তে থাকবে; বৃষ্টি হচ্ছে, গরম পড়ছে—এটা যতদিন চলতে থাকবে, ডেঙ্গু ততদিন বাড়বে এবং বৃষ্টি শেষ হওয়ার পরের একমাস ডেঙ্গু বাড়বে’—বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। পাশাপাশি তারা হামের সংক্রমণ বিষয়ে বলেছেন—হাম মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ দেখা যাচ্ছে এখন। আর এটা হয়েছে অসম্পূর্ণ টিকাদানের কারণে।
বৃষ্টি, গরম—এমন আবহাওয়াতে এডিস মশা প্রজননের অনুকূল পরিবেশ পায়। ফলে এডিস মশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আর ডেঙ্গু রোগী বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর পরিসংখ্যানও। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন আরো ১ হাজার ৭৮২ জন এবং মৃত্যু হয়েছে আট জনার। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চলতি বছর সেপ্টেম্বর ২৪ তারিখ পর্যন্ত দেশে মোট ৬৯ হাজার ১৪৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসের ২৪ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩ হাজার ৩০৩ জন, যা এ বছরের এক মাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণ। আর এ মাসের ২৪ দিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১১২ জনের।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগী নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এখন তো ডেঙ্গু বাড়তে থাকবে, বৃষ্টি হচ্ছে, গরম পড়ছে, এটা যতদিন চলতে থাকবে, ডেঙ্গু বাড়বে। বৃষ্টি শেষ হওয়ার পরের একমাস ডেঙ্গু বাড়বে, তারপর ধীরে ধীরে কমে আসবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৫ হাজার ৬৬ জন। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। আর মৃতদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ও ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২০৯ জন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা মহানগরে ৩৪৫ জন, ঢাকা বিভাগে (মহানগরের বাইরে) ৩৭১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮৮ জন, বরিশাল বিভাগে ১৬৪ জন, খুলনা বিভাগে ২৭৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৩০ জন, সিলেট বিভাগে ১৭ জন, রংপুর বিভাগে ৭৩ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১০৮ জন রয়েছেন।
প্রভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, মশা এখন অপ্রতিরোধ্যভাবে বাড়ছে। আর এডিস মশার বিস্তার যত বাড়বে, ডেঙ্গুর বিস্তার তত বাড়বে। তাই ডেঙ্গু প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং আমরা আশঙ্কা করছি এবারের ডেঙ্গুটা মারাত্মক হতে পারে। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি হতে পারে। ডেঙ্গুকে থামাতে বা প্রতিরোধ করতে হলে ডেঙ্গুর যে বাহক এডিস মশাকে মারতে হবে বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু মহামারির মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে।
হামের এখন দ্বিতীয় ঢেউ দেখা যাচ্ছে :হাম মহামারি দ্বিতীয় ঢেউ এখন দেখা যাচ্ছে। এটা অসম্পূর্ণ টিকাদানের কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসন। তিনি ইত্তেফাককে বলেছেন, কোন কোন জায়গায় টিকা একেবারে দেওয়া হয় নাই। ফলে সংক্রমণ এমন ভাবে হচ্ছে যে— বয়স্ক মানুষ এবং ছয় মাসের কম বয়সিদেরও মধ্যেও হাম হচ্ছে। কিন্তু টিকা তো সবাইকে দেওয়া হয়নি। এমনকি মায়েদের না। এ কারণে হামের প্রকোপ বেড়ে গেছে। কোন পকেট বাদ দেওয়া যাবে না। প্রত্যেকটা জনপদে ৯৫ শতাংশ কাভারেজ দিতে হবে। তিনি বলেন, টিকা খুব বেশি হলে ৮০ ভাগ কাজারেজ কয়েছে। শিশুর সংখ্যা কম দেখিয়ে, এলোপাতাড়ি টিকা দেওয়া হয়েছে। যারা টিকা নিতে আসেনি তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হয়নি। এখন দেখা যাক ২৫ তারিখ টিকা আসার পর কী হয়। টিকা না দিতে পারলে কোন লাভ হবে না বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১১৮৩ শিশু। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে হামের তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখন থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮০ শিশুর মৃত্যুর হয়েছে। হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে আরো ১০১ শিশুর। এ নিয়ে হাম ও উপসর্গে মোট শিশুমৃত্যু হয়েছে—১ হাজার ৮১ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত হিসেবে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৩ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৫৩। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪৪ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩২ শিশুর। এ সময়ের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৯৫১ জনের।