চোখ থাকিতে অন্ধ কেন?

চোখ থাকিতে অন্ধ হইবারও সম্ভবত একটি কৌশল রহিয়াছে এবং উহা আমরা বেশ ভালোমতোই রপ্ত করিয়াছি। টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটিরও অধিক টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ তাহারই আরেকটি দৃষ্টান্ত। যেই নির্মাণকাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হইতেছে, সেইখানে রডের জায়গা লইয়া বাঁশ দাঁড়াইয়া গেল-ইহা সংশ্লিষ্টদের চোখে পড়িল না? এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের আপত্তি, ভিডিও ধারণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়মের দৃশ্য ছড়াইয়া পড়িবার পরই কেবল সংশ্লিষ্টদের টনক নড়িতে দেখা গিয়াছে। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর মান রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতদের চোখ আসলে কোথায় ছিল? ইহার চাইতে বড় প্রশ্ন, অনিয়মটি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ভাইরাল' না হইত, তাহা হইলে কি বাঁশই নীরবে রডের দায়িত্ব পালন করিয়া যাইত? অবশ্য পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটি, মামলা, গ্রেফতার এবং দায়িত্বশীল এক প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজের ন্যায় পদক্ষেপ লওয়ার দেখা গিয়াছে।

দুর্নীতি ও অনিয়মের এমন চিত্র আমাদের দেশে নূতন নহে। তবে উদ্বেগের বিষয় হইল, অনিয়ম ধরিবার দায়িত্ব যাহাদের, অনেক সময় তাহাদের পূর্বে উহা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে। রাস্তা নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী, সেতুতে নকশাবহির্ভূত কাজ, সরকারি ভবনে ত্রুটি-কোনো কিছুই যেন নাগরিকের মোবাইল ফোনের ক্যামেরা এড়াইতে পারে না। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়মিত পরিদর্শন কখনো কখনো তাহা এড়াইয়া যায়। ইহা যেন আমাদের তদারকি ব্যবস্থার একটি অলিখিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আগে মানুষ দেখিবে, পরে কর্তৃপক্ষ দেখিবে; আগে ছবি উঠিবে, পরে ফাইল নড়িবে; আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরব হইবে, পরে দায়িত্বশীলদের ঘুম ভাঙিবে-এ কেমন প্রবণতা? এই দুর্বল অব্যবস্থাপনা কি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাও দুর্বল করিতেছে না?

উন্নত দেশসমূহের নির্মাণব্যবস্থায় চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সকল সমাজে কাজের মান নিশ্চিত করিবার জন্য নকশা অনুমোদন, নির্ধারিত মানের উপকরণ, ধাপে ধাপে পরিদর্শন, পরীক্ষাগারে গুণমান যাচাই, নথিভুক্তি এবং দায়িত্ব নির্ধারণ প্রভৃতি সকল কিছুর একটি সুসংবদ্ধ কাঠামো রহিয়াছে। নির্মাণকাজের গুণমান যাচাইয়ের জন্য মানদণ্ডভিত্তিক ব্যবস্থা তো রহিয়াছে; অধিকন্তু সেইখানে নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ের মান নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পরিদর্শন ও নথিপত্র সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ, তাহারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি ভাইরাল হইবার অপেক্ষায় বসিয়া থাকে না, বরং নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারিই তাহাদের ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি।

মনে রাখিতে হইবে, রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার কোনো ছোটখাটো কারিগরি ভুল নহে। একটি সেতু কিংবা সড়কের নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অর্থ হইল, ভবিষ্যতে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলিয়া দেওয়া। ইহাও মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের আমানত, উহার অপচয় আদৌ কাম্য নহে। সুতরাং, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির জন্য অনিয়ম দেখিয়া নীরব থাকা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি দায়িত্ব পালন না করিয়া কেবল ঘটনার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও যথেষ্ট নহে। দায়িত্বের প্রকৃত অর্থ হইল, বিপদ ঘটিবার পূর্বেই বিপদের কারণটি শনাক্ত করা এবং ব্যবস্থা লওয়া।

আলোচিত ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে নাগরিকের সচেতনতা অবশ্যই আমাদের আশার জায়গা। যাহারা অনিয়ম দেখিয়া ছবি তুলিতেছেন, প্রতিবাদ করিতেছেন, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছেন, তাহারা সমাজের জন্য এক ধরনের প্রহরীর ভূমিকা পালন করিতেছেন। তবে রাষ্ট্রীয় তদারকির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নাগরিকের কাঁধে চাপাইয়া দেওয়া কতটা সমীচীন হইবে, তাহাও ভাবিতে হইবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্যামেরা কখনোই সরকারি পরিদর্শকের চোখের বিকল্প হইতে পারে না। অতএব, আমাদের এমন ব্যবস্থার অবতারণা ঘটাইতে হইবে, যেইখানে অনিয়ম 'ভাইরাল' হওয়ার পূর্বেই ধরা পড়িবে, সংবাদমাধ্যমে আসিবার পূর্বেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতিবাদের পূর্বেই দায়িত্বশীলরা মাঠে নামিয়া পড়িবেন। কেবল উন্নত স্থাপনা নহে, বরং সেই স্থাপনার প্রতিটি বিষয়ের প্রতি 'দায়িত্বশীল চোখ' রাখিবার সংস্কৃতিই প্রকৃত উন্নয়নের পরিচায়ক। চোখ থাকিয়াও সেই চোখ যদি এইগুলি না দেখে, তাহা হইলে নিশ্চিতভাবে সমস্যা বাঁশে নহে, বরং উহা আমাদের খোদ দায়িত্ববোধের জায়গাটিতেই শেকড় গাড়িয়া বসিয়াছে।