'মানুষ সমস্যা নহে, মানুষই সমাধান'

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যের একটি মর্মকথা আজিকার অস্থির পৃথিবীর জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলিয়াছেন, 'মানুষ সমস্যা নহে, মানুষই সমাধান।' কথাটি শুনিতে যতটা সহজ মনে হয়, তাহার তাৎপর্য ঠিক ততটাই গভীর। জাতিসংঘের হিসাব বলিতেছে, পৃথিবীতে এখন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২০ কোটি। পৃথিবীর বয়স বাড়িতেছে, প্রযুক্তি আগাইতেছে, সভ্যতা প্রতিনিয়ত নূতন নূতন বিস্ময় উপহার দিতেছে; কিন্তু সেই পুরাতন প্রশ্নটি যেন রহিয়াই গিয়াছে-মানুষ কি সত্যিই আগাইতেছে? বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিছক ভোগকারী, কর্মসংস্থানের চাপ সৃষ্টিকারী কিংবা সম্পদের উপর বোঝা হিসাবে দেখিতে পারেন অনেকে। অথচ মানুষের জ্ঞান, শ্রম, সৃজনশীলতা ও বিবেকই বিশ্বের প্রকৃত সম্পদ। যুদ্ধ থামানো, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, দারিদ্র্য হ্রাস কিংবা প্রযুক্তির সুফল নিশ্চিত করিবার প্রশ্নে মানুষের কোনো বিকল্প নাই। বরং আধুনিক বিশ্বের চমক, তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই ত্বরিত গতিতে অগ্রসর হউক না কেন, উহাকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্যও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন পড়িবে মানুষের বিবেচনা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। বর্তমানে যেইভাবে যুদ্ধের আগুনে মানুষ পুড়িতেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঘর হারাইতেছে, দারিদ্র্য ও বৈষম্যে কোটি কোটি মানুষ পিছাইয়া যাইতেছে, তাহার উত্তরণ ঘটাইতেও মানুষই 'সমাধান'।

উন্নত বিশ্ব এই সত্যটি অনেক পূর্বেই বুঝিয়াছে। তাই সেইখানে মানুষকে কেবল 'কর্মসংস্থানের প্রার্থী' হিসাবে দেখা হয় না। বরং সেই সকল দেশে মানুষকে দক্ষ করিয়া তোলা হয়, নূতন প্রযুক্তির সহিত খাপ খাওয়ানো হয়, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাহার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হয়। তাহারা গবেষণায় দেখিয়াছে, মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রহিয়াছে। আর এই কারণে জনসংখ্যাকে বোঝা বানাইয়া না রাখিয়া সম্পদে পরিণত করিতে সচেষ্ট হইয়াছে তাহারা। ইহার ফলও তাহারা পাইতেছে হাতে হাতে। হিসাবটি স্পষ্ট-যেই সমাজের মানুষ যত দক্ষ, তাহাদের অর্থনীতি তত শক্তিশালী। যেই জাতি যত শিক্ষিত ও সচেতন, তাহাদের সমাজ তত স্থিতিশীল। পরিতাপের বিষয় হইল, উন্নয়নশীল সমাজ এই বাস্তবতা যেন বুঝিয়াও বুঝিতে চাহে না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের হিসাব যেন তাহাদের নিকট জটিল, দুর্বোধ্য!
ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া মানুষের তৈরি সমস্যার সমাধানও আবার মানুষকেই করিতে হইবে। তবে জাতিসংঘে বিশ্বনেতারা যখন শান্তি, নিরাপত্তা ও সহযোগিতার কথা বলিতেছেন, তখন একই বিশ্বসভায় মতভেদ ও গণ-ওয়াকআউটের দৃশ্যও দেখা যাইতেছে। অবশ্য ইহা আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে যে, সমস্যা সমাধানের জন্য যতই প্রতিষ্ঠান থাকুক না কেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মানবিক বিবেকের কোনোই বিকল্প নাই। বিশ্বনেতাদের মিথ্যার ফুলঝুরি, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস কিংবা শক্তির অহংকার যদি মানুষের কণ্ঠকে কখনো চাপাও দিয়া দেয়, তাহার পরও দিনশেষে মানবতারই জয় হইবে। কোটি কোটি মস্তিষ্ক যদি অস্ত্র তৈরির পরিবর্তে জ্ঞান ও উদ্ভাবনে ব্যস্ত হইয়া উঠে এবং কোটি কোটি হৃদয় যদি বিভেদের পরিবর্তে মানবতার পক্ষে স্পন্দিত হইতে শুরু করে, তাহা হইলে এই বসুন্ধরা বদলাইয়া যাইতে কতক্ষণ? যুদ্ধ থামানোর শক্তি মানুষের, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার জ্ঞানও মানুষের, নূতন পৃথিবী বিনির্মাণের কল্পনাশক্তিও মানুষের।

অতএব, মানুষের সংখ্যা বা 'মানুষ' লইয়া উদ্বেগ নহে, বরং মানুষের সম্ভাবনা লইয়া ভাবিবার সময় এখন। শিক্ষায় বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার বিকাশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেই জাতি যত অধিক বিনিয়োগ করিবে, তাহার ভবিষ্যৎ তত অধিক নিরাপদ হইবে। শান্তির জন্য কেবল চুক্তি যথেষ্ট নহে; বরং প্রয়োজন এমন মানুষ, যাহারা শান্তির মূল্য বোঝে। মানুষকে গড়িতে পারিলে সেই মানুষই পৃথিবীকে গড়িবে; অন্যদিকে মানুষকে হারাইয়া ফেলিলে কোনো প্রযুক্তি বা প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্ষমতাই এই পৃথিবীকে বাঁচাইতে পারিবে না। বিশ্বনেতারা ইহা বুঝিবেন কবে?