‘১০ তলায় উঠতে ভয় লাগে, তাই না খেয়েই থাকি’

দশ তলা বহুতল আবাসিক ভবন, অথচ চালুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সচল হয়নি কোনো লিফট। প্রতিদিন শত শত সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামার চরম ক্লান্তিতে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসের বিরতিতে কক্ষে ফেরা বন্ধ করে দিয়েছেন; এমনকি নিচে নামার ভয়ে অনেকে দিনের পর দিন খাবার না খেয়ে পার করছেন। তীব্র আবাসন সংকট নিরসনে চালু করা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) নতুন বেগম খালেদা জিয়া হলের ৫৪৪ জন নারী শিক্ষার্থী এখন এই দুঃসহ ভোগান্তির শিকার।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় বেগম খালেদা জিয়া হলের। প্রাথমিক অবস্থায় ভবনের প্রথম ছয় তলা বসবাসের উপযোগী করে ৩৫০ জন ছাত্রীকে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বাকি তলাগুলোর কাজ শেষ হলে চলতি বছরের ৫ জুলাই থেকে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা হয়। বর্তমানে এই বহুতল হলে নিয়মিত বসবাস করছেন ৫৪৪ জন ছাত্রী।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিদিন ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য দাপ্তরিক কাজে দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে তারা শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। বিশেষ করে ক্লাসের মাঝে এক বা দুই ঘণ্টার বিরতি থাকলেও সিঁড়ি ভাঙার আতঙ্কে অনেকেই নিজ কক্ষে ফিরতে পারেন না। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসের সময় আলাদা থাকায় দিনে একাধিকবার ওঠা-নামার ধকলে সবচেয়ে বেশি কাহিল হচ্ছেন ওপরের তলার ছাত্রীরা। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে নিজেরা সামান্য রান্না করে খাবেন—এমন কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি হলে। নিচতলায় থাকা ক্যান্টিন বন্ধ থাকলে বা নিচে নামতে না পারলে অনাহারে থাকতে হয় তাদের। সেই সঙ্গে ক্যান্টিনের খাবারের মান, পুষ্টি, বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্য ও পরিবেশনের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

পশুপালন অনুষদের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, যিনি অষ্টম তলায় থাকেন, তিনি বলেন, ‘ক্লাস শেষে এমনিতেই ক্লান্ত থাকি। এরপর এত ওপরে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে আরও কাহিল হয়ে পড়ি। ক্লাসের ফাঁকে এক-দুই ঘণ্টা বিরতি পেলেও ভোগান্তির ভয়ে রুমে ফিরতে পারি না। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাস দিনে দুই সময়ে হওয়ায় হলে আসা-যাওয়া করা মারাত্মক কষ্টের। আমাদের খাবার নেওয়ার ক্যান্টিনও একদম নিচতলায়। খাবার আনতে নিচতলা পর্যন্ত যাতায়াত করা দুঃসহ এক অভিজ্ঞতা। এর ওপর ক্যান্টিনের খাবারের মানও তেমন ভালো নয়।’

দশম তলায় বরাদ্দ পাওয়া প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘১০ তলায় সিট পাওয়ায় সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একবার ওপরে উঠলে আবার নিচে নামার সাহস পাই না। এ কারণে অনেক সময় দিনে কেবল এক বেলা খাবার খাই। একবার নিচে নেমে খাবার নিয়ে আসি, সকালের নাশতা খাওয়ার সুযোগই হয় না। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার ক্লাস বন্ধ থাকলে খাবারের কষ্ট আরও প্রকট রূপ নেয়। হলে নিজেরা কিছু রান্না করার বিকল্প কোনো সুযোগ নেই। তাই ১০ তলায় উঠতে ভয় লাগে, বাধ্য হয়ে অনেক সময় না খেয়েই থাকতে হয়।’

আবাসিক আরেক শিক্ষার্থী তুলে ধরেন জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি। তিনি বলেন, ‘কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তলা আবাসিক হলে লিফট অচল থাকা বিরল ঘটনা। সকাল-বিকাল ক্লাসের পর দীর্ঘ সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি। সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন ওপরের তলার কোনো ছাত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসা শেষে আবার ওপরে তোলা যে কতটা অমানবিক, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। স্বাভাবিক পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার স্বার্থে অবিলম্বে লিফট চালু করা প্রয়োজন।’

শিক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগ ও ক্ষোভের বিষয়ে হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. ইসমাইল হোসেন জানান, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ সম্পূর্ণ যৌক্তিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় দ্রুত এই সংকট নিরসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর হাউস টিউটর ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে এবং লিফট স্থাপনের কার্যক্রম দ্রুত গতিতে চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত একটি লিফট শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে। শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের এই কষ্ট তারা অনুধাবন করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

লিফট স্থাপনের কারিগরি অগ্রগতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মুহ. এনামুল হক জানান, খালেদা জিয়া হলের জন্য বরাদ্দ করা জাপানি প্রযুক্তির নতুন লিফটটির মেশিনসহ মূল কাঠামোগত স্থাপনের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে এটি তৃতীয় তলা পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে সচল রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে আরও প্রায় সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। পরীক্ষামূলক যাচাই শেষে এটি স্থায়ীভাবে চলাচলের উপযোগী ঘোষণা করা হবে।

প্রধান প্রকৌশলী আরও জানান, বর্তমানে একটি লিফট চালু করার লক্ষ্য নিয়ে সর্বাত্মক কাজ চলছে। বাকি লিফটগুলোর যন্ত্রাংশ ক্যাম্পাসে পৌঁছালেও সেগুলোর ইনস্টলেশন এখনও শুরু করা যায়নি। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটিহীন সেবা নিশ্চিত করে আপাতত একটি লিফট দ্রুত সচল করাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।