যুদ্ধের বাজেট নয়, প্রয়োজন শান্তির বিনিয়োগ 

পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ যুদ্ধের জন্য যত অর্থ ব্যয় করেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কি তার সামান্য অংশও ব্যয় করেছে? প্রশ্নটি সরল, কিন্তু উত্তরটি অস্বস্তিকর। ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Invest in Peace: For Everyone, Everywhere, Every Day’। জাতিসংঘ এবার শান্তিকে শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি হিসেবে দেখেনি; বরং নিরাপত্তা, মর্যাদা, সুযোগ ও সহযোগিতার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছে। এই প্রতিপাদ্যের মধ্যে একটি গভীর অর্থ আছে। শান্তি নিজে নিজে আসে না। শান্তি তৈরি করতে হয়, রক্ষা করতে হয় এবং প্রতিদিন তাতে বিনিয়োগ করতে হয়।

এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালিত হলো, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, রাজনৈতিক বিভাজন ও নিরাপত্তাহীনতা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৬ সালের শান্তি দিবসের বার্তায় বলেছেন, সংঘাতের পরিসর ও জটিলতা বাড়ছে, সীমান্ত পেরিয়ে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে এবং সংলাপ ও বৈশ্বিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। গাজা, ইরান, ইউক্রেন, ইথিওপিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন সংঘাতের অভিঘাত আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়Ñযুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে, কিন্তু যুদ্ধের মূল্য দিতে হয় মায়ের, বাবার, শিশুর, কৃষকের, শ্রমিকের, শিক্ষার্থীর। 

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিরিসার্চ ইনস্টিটিউট-SIPRI-এর ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ীÑ২০২৫ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ২.৮৮৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এক দশকে, ২০১৬ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে, সামরিক ব্যয় বাস্তব হিসাবে ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয় বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশের সমান ছিল।

অবশ্যই প্রতিটি রাষ্ট্রের আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে। কোনো দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সরলীকৃত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়-বিশ্ব যদি অস্ত্রের পেছনে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে, তাহলে সংঘাত প্রতিরোধ, সংলাপ, শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে না কেন?

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করা, হাসপাতাল ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার চেয়ে যুদ্ধের কারণগুলো আগে শনাক্ত করে সমাধানের চেষ্টা করা কি অনেক বেশি যুক্তিসংগত নয়? শান্তির বিনিয়োগ তাই কোনো আবেগের বিষয় মাত্র নয়; এটি অর্থনৈতিক যুক্তিরও বিষয়।

শান্তিতে বিনিয়োগের অর্থ কী? শান্তিতে বিনিয়োগ শুনলে অনেকেই ভাবতে পারেনÑএটি বুঝি কেবল কূটনীতিকদের কাজ। আসলে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত।

শান্তিতে বিনিয়োগ মানে শিক্ষায়, কর্মসংস্থানে, ন্যায়বিচারে, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায়, মানবাধিকারে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে, আইনের শাসন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ। এমনকি মানুষের পারস্পরিক আস্থা তৈরিতেও বিনিয়োগ।

একটি বিদ্যালয়ে যদি শিশুকে শেখানো হয়-ভিন্নমত মানেই শত্রু নয়, ভিন্ন ধর্ম মানেই দূরত্ব নয়, ভিন্ন ভাষা মানেই বৈরিতা নয়, দুর্বল মানুষকে উপহাস করা নয় বরং সাহায্য করাÑতাহলে সেই বিদ্যালয় আসলে শান্তির একটি ছোট কারখানা। একজন শিক্ষক যখন দুই শিক্ষার্থীর বিরোধ মীমাংসা করতে শেখান, তখন তিনি শুধু একটি স্কুলের সমস্যা সমাধান করেন না; ভবিষ্যতের একজন নাগরিককে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপের শিক্ষা দেন। সেই বিনিয়োগের হিসাব কোনো বাজেট বইয়ে দেখা যায় না। কিন্তু তার ফল পাওয়া যায় বহু বছর পরে। অন্যদিকে বিশ্বশান্তির বীজ অনেক সময় একটি পরিবারের ডাইনিং টেবিলেই রোপিত হয়। মতের অমিল থাকবে, শত্রুতা কেন? মানুষের চিন্তা এক হবে না-এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক মত আলাদা হবে, ধর্মীয় ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকবে, অর্থনীতি বা সংস্কৃতি নিয়ে ভিন্ন মত থাকবে। কিন্তু মতের অমিলকে যদি আমরা ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করি, তখন গণতান্ত্রিক সমাজও অশান্ত হয়ে ওঠে। শান্তির বিশাল দর্শন অপরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা। ভিন্নমতকে নিশ্চিহ্ন করা শান্তি নয়। বরং ভিন্নমতকে নিরাপদে প্রকাশ করার পরিবেশ তৈরি করাই শান্তির অন্যতম শর্ত। 

ন্যায়বিচার ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সম্ভব কি? যেখানে মানুষ মনে করে তার কথা কেউ শুনবে না, যেখানে অন্যায় হলে প্রতিকার পাওয়া যাবে না, যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল মানুষের জন্য আলাদা নিয়ম কাজ করে-সেখানে ক্ষোভ জমতে থাকে। ক্ষোভ জমতে জমতে একসময় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এ কারণেই শান্তিতে বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো-আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-UNDP-ও শান্তি ও উন্নয়নকে পরস্পর সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করে এবং সংঘাতের মূল কারণ মোকাবিলা, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে UNDP ও বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃত একটি হিসাব অনুযায়ীÑসহিংস সংঘাত প্রতিরোধে প্রতি ১ ডলার ব্যয়ে সংকট মোকাবিলায় প্রায় ১৬ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। অর্থাৎ ন্যায়বিচার শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি সংঘাত প্রতিরোধেরও একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি কী? বাংলাদেশ যুদ্ধক্ষেত্র নয়। কিন্তু শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ না থাকা নয়। আমাদের শান্তি দরকার মানুষের নিরাপত্তায়, আইনের শাসনে, সামাজিক সম্প্রীতিতে, রাজনৈতিক সহনশীলতায়, মতপ্রকাশে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে। একজন তরুণ যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হন, তখন তিনি সমাজের সম্পদ। আর যখন দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, হতাশা ও অনিশ্চয়তা তাকে গ্রাস করে, তখন ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করাও শান্তিতে বিনিয়োগ। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও শান্তিতে বিনিয়োগ। শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও শান্তিতে বিনিয়োগ। দুর্নীতি ও বৈষম্য কমানোও শান্তিতে বিনিয়োগ। একজন নাগরিক যদি বিশ্বাস করেনÑআইন তার জন্যও কাজ করবে, তার কথা শোনা হবে, অন্যায় হলে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকবেÑতাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক সহযোগিতার হয়। আবার নাগরিক যদি মনে করেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই তার পাশে নেই, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

শান্তিপূর্ণ একটি সমাজে শিশু নিরাপদে স্কুলে যায়। কৃষক জমিতে চাষ করেন। ব্যবসায়ী বিনিয়োগের সাহস পান। তরুণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন। পরিবার স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। অর্থাৎ শান্তি হলো এমন একটি সম্পদ, যার লভ্যাংশ প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাওয়া যায়। UNDP-এর সাম্প্রতিক তথ্যেও শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ, সুশাসন ও উন্নয়নে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাদের হিসাবে সহিংসতার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যয় বিপুল-প্রায় ১৩ শতাংশ বৈশ্বিক জিডিপির সমপরিমাণ বলে একটি UNDP হিসাব উল্লেখ করে। তাহলে শান্তির জন্য ব্যয়কে আমরা কেন ‘খরচ’ হিসেবে দেখব? শান্তিতে ব্যয় আসলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়।

আমরা ব্যাংকে টাকা রাখি ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য। সন্তানকে শিক্ষিত করি ভবিষ্যতের জন্য। বাড়ি বানাই ভবিষ্যতের জন্য। তাহলে শান্তিতে বিনিয়োগ করব না কেন? অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে একটি দেশের শক্তি মাপা যায়; কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আস্থার মাত্রা দিয়েও একটি সমাজের শক্তি মাপা যায়। পৃথিবীকে সম্পূর্ণ যুদ্ধমুক্ত করা হয়তো এক দিনে সম্ভব নয়। কিন্তু যুদ্ধের সম্ভাবনা কমানো সম্ভব। ঘৃণা কমানো সম্ভব। সংলাপ বাড়ানো সম্ভব। অন্যায়ের প্রতিকার করা সম্ভব। মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা সম্ভব। আর এসবের জন্য শুরু করতে হবে আজ থেকেই। সবার জন্য। সর্বত্র। প্রতিদিন।

শান্তি কোনো উপহার নয়, যা কেউ এসে আমাদের হাতে তুলে দেবে। শান্তি একটি নির্মাণকাজ। এই নির্মাণকাজে ইট হতে পারে শিক্ষা, সিমেন্ট হতে পারে ন্যায়বিচার, ভিত্তি হতে পারে মানবিকতা, আর ছাদ হতে পারে পারস্পরিক আস্থা। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের শান্তি দিবসের আহ্বান তাই শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য নয়; আমাদের প্রত্যেকের জন্য। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তিচুক্তি কোনো সম্মেলনকক্ষে স্বাক্ষরিত হয় না। প্রতিদিন একজন মানুষ যখন আরেক জন মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করে-সেখানেই শান্তির সবচেয়ে ছোট, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগটি শুরু হয়।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক