একটি শতাব্দী খুব দীর্ঘ সময় নহে; কিন্তু এই এক শতাব্দীতে পৃথিবী এমনভাবে বদলাইয়াছে, যাহা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব। গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপের শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ উপনিবেশ দখল, আধিপত্য বিস্তার এবং দুইটি বিশ্বযুদ্ধে পরস্পরকে ধ্বংস করিতে ব্যস্ত ছিল। আর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ তখন দারিদ্র্য, অশিক্ষা, রোগ ও পশ্চাৎপদতার মধ্যে জীবন কাটাইতেছিল। আমাদের এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনও ছিল সেই বাস্তবতার অংশ। তাহার পর পৃথিবী বদলাইয়াছে। বিজ্ঞান মানুষের আয়ু বাড়াইয়াছে, রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র দিয়াছে, যোগাযোগের দূরত্ব প্রায় বিলীন করিয়াছে। বিদ্যুৎ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট-সকল শেষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-মানুষের জীবনকে এমনভাবে পালটাইয়াছে, যাহা ১০০ বৎসর পূর্বের মানুষের কাছে প্রায় কল্পকাহিনির মতো মনে হইত। বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের বাহিরে নহে। গ্রামের মানুষের হাতেও আজ স্মার্টফোন, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তে তাহার কাছে পৌঁছাইয়া যায়; কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আমরা এড়াইতে পারি না-আমরা কি সভ্য হইতে পারিয়াছি?
বাংলাদেশের বাস্তবতা এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর দেয় না। বিভিন্ন সময় সরকার বদলাইয়াছে, রাজনৈতিক স্লোগান বদলাইয়াছে; কিন্তু মানুষের উপর মানুষের সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতার প্রবণতা বদলায় নাই। বিগত বৎসর, ২০২৫ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে মব-সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন নিহত হইয়াছেন। একই বছরে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১৪টি ঘটনায় নিহত হইয়াছেন ১৩৩ জন, আহত ৭ হাজার ৫১১ জন। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংস্থাটির হিসাবে ২৬১টি মব-সহিংসতার ঘটনায় নিহত হইয়াছেন ১৩৩ জন। হামলা-মামলার হিসাবের তো ইয়ত্তা নাই। ইহা কি কেবল সাধারণ পরিসংখ্যান? প্রতিটি সংখ্যা একটি মানুষ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন। আরও ভয়ংকর বিষয় হইল, অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়াই বহু ক্ষেত্রে মানুষকে উগ্র জনতার হাতে শাস্তি দেওয়া হইতেছে। আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখিতে শিখি নাই, শত্রু হিসাবে দেখিতে শিখিয়াছি। ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার পরিবর্তে তাহাকে অপমান কিংবা দমন করিবার প্রবণতা দেখা যায়। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করিয়া উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব মুহূর্তে ছড়াইয়া পড়ে, সংখ্যালঘু ও দুর্বল মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কখনো কখনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ও ভিন্নমতের কণ্ঠও জনতার ক্রোধের লক্ষ্য হইয়া উঠে। অথচ আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন এমন ছিল না। যাহারা এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রামে জীবন দিয়াছেন, তাহাদের আকাঙ্ক্ষা কেবল একটি পতাকা কিংবা একটি মানচিত্রের জন্য ছিল না। তাহারা চাহিয়াছিলেন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের মর্যাদা থাকিবে, আইনের শাসন থাকিবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অধিকার থাকিবে এবং ভিন্নমতের মানুষকে নিশ্চিহ্ন করিবার পরিবর্তে তাহার সহিত কথা বলা হইবে।
আমাদের হাতে আজ এমন প্রযুক্তি আছে, যাহা কয়েক সেকেন্ডে কোটি মানুষের কাছে একটি কথা পৌঁছাইয়া দিতে পারে; কিন্তু সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের বিবেক কি সেই গতিতে তৈরি হইয়াছে? আমরা সন্তানদের সর্বাধুনিক যন্ত্র দিতেছি; কিন্তু তাহাদের কি শেখাইতেছি অন্যকে সম্মান করিতে, ভিন্নমত শুনিতে এবং ক্রোধের পরিবর্তে যুক্তিকে বাছিয়া লইতে?
সভ্যতার মাপকাঠি হইল-দুর্বল মানুষ কতটা নিরাপদ, ভিন্নমতের মানুষ কতটা নির্ভয়ে কথা বলিতে পারে, সংখ্যালঘু নাগরিক কতটা নিশ্চিন্ত এবং অভিযুক্ত মানুষটি জনতার হাতে নয়, আইনের হাতে কতটা নিরাপদ। আমরা আধুনিক হইয়াছি, সন্দেহ নাই; কিন্তু আধুনিকতা আর সভ্যতা এক জিনিস নহে। এই কারণে স্বাধীনতার এত বৎসর পর তাই প্রশ্নটি এড়াইবার উপায় নাই-যেই সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল সমাজের স্বপ্ন দেখিয়া মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়াছিল, আমরা কি কখনো সেই সমাজ নির্মাণ করিতে পারিব? ইহা আজ বিলিয়ন টাকার প্রশ্ন।