জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সকালেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন নানা পেশার মানুষ। কারও গন্তব্য অফিস, কারও কারখানা বা দোকান, আবার কেউ ছুটছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে।
সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কর্মজীবন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে একজন মুসলিমের কাছে চাকরি শুধু বেতন পাওয়ার মাধ্যম নয়; কর্মক্ষেত্রও সততা, আমানতদারি, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির পরীক্ষাস্থল। ইসলাম কর্মমুখরতা শেখায়, হালাল জীবিকা অর্জনে উৎসাহিত করে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।’ (সুরা : আল-জুমুআহ, আয়াত : ১০)
তাই হালাল পথে জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি সেই উপার্জনের পথে ইসলামের নীতিমালা মেনে চলাও জরুরি।
বেতনের প্রতিটি টাকায় থাকুক হালালের স্বস্তি
একজন চাকরিজীবী মাস শেষে বেতন হাতে পান। সেই অর্থ দিয়ে বাজার করেন, বাড়িভাড়া দেন, সন্তানের মাদরাসা/স্কুলের ফি পরিশোধ করেন, মা-বাবার জন্য ওষুধ কেনেন। তাই উপার্জনের উৎস পবিত্র হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো ভক্ষণ করেনি।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
সময় ও দায়িত্বের আমানত কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় ও দায়িত্বের আমানত। একজন কর্মী যে সময়ের বিনিময়ে বেতন নিচ্ছেন, সেই সময়টুকু প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় করা তাঁর দায়িত্ব এবং এটি তাঁর কাছে আমাতন। কোনো কারসাজির মাধ্যমে এই আমানতের খেয়ানত করলে আল্লাহর দরবারে এর হিসাব দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ৫৮)
অতএব, ইচ্ছাকৃতভাবে আমানতের খেয়ানত করার জন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা নিষিদ্ধ।
কর্মক্ষেত্রে পরিচয় হোক চরিত্রে
কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে যোগ্যতার সঙ্গে উত্তম চরিত্রের সমন্বয় না থাকলে সেই যোগ্যতা অনেক সময় কল্যাণ বয়ে আনে না। একজন কর্মকর্তা অধীন কর্মীর সঙ্গে কেমন আচরণ করছেন, একজন কর্মী সহকর্মীর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছেন—এসবও ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর্মস্থলে কাউকে ছোট করা, সহকর্মীর ভুলকে বাড়িয়ে বলা, তাঁর পেছনে নিন্দা করা, অন্যের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কিংবা অহংকার করা নিন্দনীয় কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি উপহাস কোরো না...এবং একে অন্যের গিবত কোরো না।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১১-১২)
কর্মজীবন হোক ইবাদতের সহযাত্রী
কর্মজীবনের ব্যস্ততা অনেক সময় মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করে যে জীবিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও পরিবারের প্রাপ্য সময়ও কমে যায়। অথচ জীবিকার জন্য কাজ করতে গিয়ে জীবনের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলা উচিত নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা: আন-নিসা, আয়াত: ১০৩)
কর্মস্থলে নামাজের সময় হলে যথাসম্ভব নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা এবং কাজের কারণে ফরজ ইবাদতকে অবহেলা না করা একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে নিজের পেশায় দক্ষতা অর্জন করাও দায়িত্বের অংশ। চিকিৎসককে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষ হতে হবে, শিক্ষককে নিজের বিষয়ে জ্ঞানী হতে হবে, প্রকৌশলীকে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতে হবে এবং ব্যবসায়ীকে লেনদেনের বিধান জানতে হবে। অযোগ্যতা লুকিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা নিজের ও অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতএব, দিনশেষে ঘরে ফেরার সময় ক্লান্ত শরীরের সঙ্গে যদি একজন মানুষ এই প্রশান্তি নিয়েও ফিরতে পারে যে, ‘আজ আমি কারো হক নষ্ট করিনি, হারাম উপার্জন করিনি এবং আমার দায়িত্বে ফাঁকি দিইনি’, তাহলে তার কর্মজীবনও হতে পারে সফল এবং ইবাদতের একটি সুন্দর মাধ্যম।