রাজধানীর মিরপুরে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালানোর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হলে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো যেত বলে মন্তব্য করেছেন আমীরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, 'এখানে ধরেন দুইটা নির্বাচনী এলাকা পড়েছে। এই এলাকা ১৬ নম্বর, ওই এলাকা হচ্ছে ১৫ নম্বর। আমরা এখানে যারা এমপিরা আছি, সংসদ সদস্য তো আপনারাই বানাইছেন, জনগণ আমাদেরকে বানাইছে। আপনাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা আমাদের দায়িত্ব।'
তিনি বলেন, 'এত বড় একটা অভিযান চালানোর আগে আমাদেরকে যদি এটাতে সম্পৃক্ত করা হতো, আমরা আশা করি যে শান্তিপূর্ণভাবে ভালো সমাধানে আমরা পৌঁছাতে পারতাম।'
জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, 'ভবিষ্যতেও আমরা আহ্বান জানাব যে সরকারের তরফ থেকে যে উদ্যোগই নেওয়া হবে জনকল্যাণে, সেটা যেন জনপ্রতিনিধিদেরকে সম্পৃক্ত করে করা হয়। তাহলে জনগণের সমর্থন এবং সহযোগিতা পাওয়া যাবে, বিশৃঙ্খলা-সন্ত্রাস থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব ইনশাআল্লাহ।'
মিরপুরের উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, 'উচ্ছেদ অভিযানের লক্ষ্য ছিল রাস্তা এবং ফুটপাতে যারা ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাদেরকে এখান থেকে উচ্ছেদ করা বা সরিয়ে দেওয়া। দেশ আমাদের সকলের। দেশের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আবার নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দেখা সরকারের দায়িত্ব।'
তিনি উল্লেখ করেন, রাজধানী ঢাকায় বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গ্রাম থেকে এসে ব্যবসা করেন। সামাজিক শৃঙ্খলার অভাবে তারা ফুটপাত ও রাস্তায় ব্যবসা করছেন। তাদের কাছ থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক বিভিন্ন ধরনের চাঁদা আদায় করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাস্তাঘাটের সুশৃঙ্খল ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, 'রাস্তাঘাট মূলত চলাচলের জন্য। যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তা, ফুটপাত মানুষের পায়ে হেঁটে চলাচলের জন্য। কিন্তু আমাদের শৃঙ্খলার অভাবে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তাগুলো পরিচ্ছন্ন, সুপরিসর না হওয়ার কারণে অনেক বিপত্তি ঘটে, কষ্ট হয় মানুষের। সাধারণ মানুষের দাবি যে রাস্তাঘাট যেন চলাচলের উপযোগী থাকে। এটাই হওয়া স্বাভাবিক।'
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম যে এই সমস্যার একটা টেকসই সমন্বিত সমাধান করতে হবে। এদেরও খাওয়া-বাঁচার ব্যবস্থা করা লাগবে। এই জন্য তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক কোনো জায়গা তৈরি করে সেই জায়গায় তারা ব্যবসা করবে। এটা থেকে ট্যাক্স পাবে সিটি করপোরেশন এবং যৌক্তিক ট্যাক্স। কোনো চাঁদাবাজি চলবে না, চাঁদার যন্ত্রণায় তাদেরকে ভুগতে হবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা চাই রাস্তা রাস্তার মতো থাকুক, পরিচ্ছন্ন থাকুক এবং রাস্তায় কোনো ব্যবসা না হোক। কিন্তু এই যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, তাদেরকেও জায়গা করে দেওয়া হোক উপযুক্ত জায়গায়। তারা যাতে ব্যবসা করতে পারে, তারা খেটে খেয়ে বাঁচতে পারে সম্মানের সঙ্গে।'
উচ্ছেদ অভিযানের সময় সরকারি যানবাহনে হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, 'আজকে কিছু সরকারি যানবাহন পোড়ানো হয়েছে, এটা ভাই ঠিক হয় নাই। যানবাহনের কোনো দোষ নাই। দোষ করলে আমরা ব্যক্তি করতে পারি। সরকারি যানবাহন কিন্তু আপনারও ট্যাক্সের টাকা, এখানে আপনিও শরিক। এইটা যদি একবার ধ্বংস হয় দেশের ক্ষতি হবে, সেই ক্ষতির অংশীদার আপনিও হবেন।'
সহিংসতায় আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, 'আবার উভয় পক্ষেই কিছু আহত হয়েছেন, আমরা সবার জন্য সমবেদনা জানাচ্ছি। আমাদের অনুরোধ, সবাই শান্ত থাকবেন। এর একটা সুষ্ঠু সমাধান আশা করি বের করা যাবে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে সবাইকে। ধৈর্য হারাইলে কোনো সমাধান নাই। ধৈর্য ধরে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে, যেই পথটা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য, সবার জন্য উপকারী।'
মসজিদের সম্পত্তিতে আগুন লাগার ঘটনা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, 'এখানে মসজিদের প্রপার্টি, এটা সম্ভবত কোনো গোডাউন, গোডাউন জাতীয় কিছু ছিল। এখানে যতটুকু বুঝতে পারলাম যে যখন উচ্ছেদ অভিযান চলে, তখন তার ছিঁড়ে গিয়ে শর্ট সার্কিট হয়েছে, আগুন লেগেছে, পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে জিনিসগুলো।'
তিনি বলেন, 'আমরা আশা করি যে এইটা পুষায়ে নিবেন তারা, মসজিদ কর্তৃপক্ষ আছেন। এবং সরকারকেও অনুরোধ করব যে মসজিদের এই প্রপার্টি টুকটাক যে ক্ষতি হয়েছে, সেইটার দিকে একটু সুনজর দেবেন।'
সারাদেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, 'আর শুধু মিরপুর না, কাফরুল না; সারা দেশের সমস্যার সমাধান করেন। চাঁদাবাজি বন্ধ করেন, দখলদারি বন্ধ করেন, দুর্নীতি বন্ধ করেন। বিভিন্ন জায়গায় মদ-মাদকের ব্যবসার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদেরকে ধরেন। আর ইতিমধ্যে যারা ঢাকা মহানগরীতে অনেকগুলো বড় অপকর্ম করেছে, তাদেরকে ধরে এনে শাস্তি দেন।'
প্রশাসনের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'প্রশাসন একা পারবে না, জনগণের সহযোগিতা লাগবে। সংগত কাজে, ভালো কাজে প্রশাসন ইনশাআল্লাহ আমাদের সবার সহযোগিতা পাবে। কিন্তু প্রশাসন যদি জালিমের ভূমিকা পালন করে আমরা রুখে দাঁড়াব। আমরা চাই না আমাদের প্রশাসন আর অতীত ফ্যাসিবাদী আমলের মতো অন্যায়ের পক্ষ নিক।'
তিনি বলেন, 'আমরা চাই দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের লালনের যে নীতি আছে, প্রশাসন যেন এটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।'