চামড়া কেনায় অর্থসংকট

ব্যাংকঋণের টাকা গেল কোথায়?

চামড়া ক্রয় ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রতি বছর ব্যাংকগুলো মোটা অঙ্কের ঋণ দিয়ে থাকে। অন্যদিকে চামড়াজাত পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয় ব্যাংক। তবুও কোরবানির পশুর চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকদের কাছে টাকা নেই বলে জানানো হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তাহলে বছর বছর ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ যায় কোথায়!

অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই ট্যানারির জন্য ঋণ নিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করছে। আবার কেউ কেউ আমদানি-রপ্তানির আড়ালে মিথ্যা ঘোষণায় বিদেশে পাচার করছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের বড়ো অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে এলেও আরো অনেক প্রতিষ্ঠানই ঋণের আড়ালে ব্যাংকের টাকা নিয়ে কারসাজি করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব কারণে বছর বছর চামড়া খাতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। বাড়ছে খেলাপিও।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্বল্প সুদে নেওয়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের জন্য দেওয়া ব্যাংক ঋণের বেশিরভাগই এখন খেলাপি হয়ে গেছে। চলতি বছর কোরবানির আগে কেবল সরকারি চারটি ব্যাংক ট্যানারি মালিকদের জন্য বরাদ্দ করেছে ৪৭০ কোটি টাকা। কাঁচা চামড়া ক্রয়ের জন্য ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। আর সবমিলিয়ে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা; কিন্তু প্রতি বছরই ট্যানারি মালিকদের মুখে একই কথা, ‘টাকার অভাবে চামড়া কেনা যাচ্ছে না।’ সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে ব্যাংক ঋণের টাকা দিয়ে কী করা হয়েছে। 

কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী দেলোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ব্যাংক ঋণের টাকা কোথায় যায়, সাম্প্রতিক ঘটনা আমাদের সামনে বড়ো উদাহরণ। তিনি বলেন, হতে পারে অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করছে, জমি বা বাড়ি কিনছে। তাদের ট্যানারি ব্যবসাও চলছে। অথচ আমাদের বকেয়া টাকা দেয় না। ট্যানারি ব্যবসায়ীদের কাছে সারা দেশের আড়তদার ও পাইকারদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে বহু বছরের পুরোনো টাকাও আছে।

গত রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বকেয়া টাকা ইস্যুতে হট্টগোল হয়েছে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের প্রতিনিধিদের মধ্যে। সূত্র জানিয়েছে, এবারো কাঁচা চামড়া কেনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কোরবানির ঈদের আগে কেবল সরকারি ব্যাংকগুলো ৪৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।

অবশ্য ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে লোকসানের কারণে অনেক ট্যানারি রুগ্ণ হয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকঋণের টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না। এর ফলে নতুন করে বরাদ্দ হলেও ঐ ঋণের টাকা ছাড় করাতে পারছেন না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) কোষাধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, লোকসানের কারণে অনেক কারখানা রুগ্ণ হয়ে গেছে। সাভারে যাওয়ার আগেই হাজারীবাগের অনেক কারখানা খেলাপি হয়ে গেছে। ব্যাংকঋণের অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ কিংবা বিদেশে পাচারের অভিযোগ সঠিক নয় বলে মনে করেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, অতীতে ব্যাংক বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোর চামড়াখাতের জন্য ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের নিয়ম মানার প্রয়োজন ছিল, তাতে ঘাটতি ছিল। এখন অনেক ঋণ আটকে যাওয়ার পর তারা অতি সতর্ক হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতীতে ছোটো ট্যানারি, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিচয়ে কেউ কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। এসব ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অনেকক্ষেত্রেই যথাযথ নিয়ম মানেনি ব্যাংক। ফলে এর একটি অংশ খেলাপি হয়ে গেছে। আবার ক্রিসেন্টের মতো বড়ো প্রতিষ্ঠান, বড়ো আকারের ঋণ নিয়েও কারসাজি করেছে। এসব ঋণের অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ, মিথ্যা তথ্যে বিদেশে পাচার কিংবা বাড়ি ও জমিসহ অনুত্পাদনশীল খাতেও বিনিয়োগ হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত অর্থেই লোকসানের কারণে কেউ কেউ খেলাপি হয়েছেন। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা উচিত বলে মনে করেন তারা।