বাংলাদেশে সরকারি চাকরি যেন সোনার হরিণ। বিশেষ করে, বিসিএস পরীক্ষা। লাখো তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। কেউ বেসরকারি চাকরি ছেড়ে, কেউ পরিবারের আর্থিক সহায়তায়, কেউ আবার রাত জেগে পড়াশোনা করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমে প্রিলিমিনারি, তারপর লিখিত, এরপর মৌখিক-একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে একজন প্রার্থী যখন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয়, তার মেধা ও যোগ্যতাকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিন্তু এখানেই কখনো কখনো শুরু হয় আরেক পরীক্ষা-পুলিশ ভেরিফিকেশন বা প্রাক্-চরিত্র যাচাই। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যাচাইয়ের উদ্দেশ্য কী? একজন প্রার্থী অপরাধী কি না, তার বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো মামলা আছে কি না, তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য আইনগতভাবে অযোগ্য কি না-এসব জানা রাষ্ট্রের অধিকার এবং প্রয়োজনও আছে। কিন্তু যদি একজন প্রার্থীর নিজের কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে তার বাবা, মা, ভাই, বোন, চাচা, মামা কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের রাজনৈতিক পরিচয় তার চাকরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন উঠবে-রাষ্ট্র কি ব্যক্তিকে বিচার করছে, নাকি তার পারিবারিক পরিচয়কে?
বাংলাদেশের বিসিএস নিয়োগের ইতিহাসে এই প্রশ্ন একেবারে নতুন নয়। প্রায় ৪০০ মেধাবী প্রার্থী শেষ মুহূর্তে বাদ ২০২০ সালে প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩২তম থেকে ৩৯তম বিসিএস পর্যন্ত প্রায় ৪০০ জন প্রার্থী পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরও নেতিবাচক পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের কারণে চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়টি বিসিএসে ২৩০ জন চিকিৎসক ছিলেন। সংবাদমাধ্যমটির অনুসন্ধানে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা ছিল না বলে তথ্য পাওয়া যায়।
৩৭তম বিসিএসের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পিএসসি বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৩১৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। কিন্তু প্রায় ৯ মাস পর প্রকাশিত গেজেটে ১ হাজার ২২১ জনের নাম আসে। অর্থাৎ ৯৩ জন প্রথম গেজেটে বাদ পড়েন। পরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৩২ জন নিয়োগ পেলেও ৬১ জন বাদ থেকে যান। তাদের মধ্যে প্রশাসন, শিক্ষা, পুলিশ, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্যাডারের প্রার্থী ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদ পড়া প্রার্থীদের কারো কারো বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা ছিল না।
এখানে একজন প্রার্থীর অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি বিসিএসের পাশাপাশি অন্য কয়েকটি সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং সেসব চাকরিতে তার পুলিশ ভেরিফিকেশন ইতিবাচক ছিল। কিন্তু বিসিএসের ক্ষেত্রে প্রতিবেদন নেতিবাচক হয়। একই ব্যক্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়োগে ভিন্ন ভিন্ন ভেরিফিকেশন ফলাফল হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড কি সব ক্ষেত্রে একই?
২৫৯ জনের ঘটনা আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত পিএসসির সুপারিশ পেয়েও নেতিবাচক পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগবঞ্চিত ২৫৯ জনকে সরকার নিয়োগ দেয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে।
যদি একজন প্রার্থী পিএসসির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পান, কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ না পান এবং কয়েক বছর পর সরকার তাকেই পুনরায় নিয়োগ দেয়-তাহলে পূর্ববর্তী নেতিবাচক প্রতিবেদনের যথার্থতা, প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
৪৩তম বিসিএস:পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে: সাম্প্রতিক ৪৩তম বিসিএসের ঘটনাও বিষয়টিকে আবার জাতীয় আলোচনায় এনেছে। পিএসসি ২১৬৩ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল। প্রথম পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৪০ জন এবং এজেন্সির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৫৯ জনসহ মোট ৯৯ জনকে বাদ দিয়ে ২ হাজার ৬৪ জনের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ২ হাজার ১৬৩ জনের বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা-এনএসআই এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর-ডিজিএফআইয়ের মাধ্যমে পুনরায় অধিকতর যাচাই-বাছাই করা হয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আরও ২২৭ জনের প্রাক্-চরিত্র সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য পাওয়া যায়। তাদের সাময়িকভাবে নিয়োগের জন্য অনুপযুক্ত বিবেচনা করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৪০ জনসহ মোট ২৬৭ জনকে বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১ হাজার ৮৯৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ৪৩তম বিসিএসের ২২৭ জনকে সরাসরি ‘পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ’ বলা যথাযথ হবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাদের বিষয়ে এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের পুনর্যাচাই প্রতিবেদনে আপত্তি বা অসুপারিশ পাওয়া যায়।
ভেরিফিকেশন কেন প্রয়োজন? পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ বাতিল করা উচিত-এমন কথা বলছি না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের আগে একজন প্রার্থীর পরিচয়, অপরাধের ইতিহাস, জালিয়াতি, গুরুতর আইনভঙ্গ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কোনো বিষয় যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-কী যাচাই করা হবে এবং কীভাবে যাচাই করা হবে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী। আর ২৯(১) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতার কথা বলা হয়েছে। অতএব সরকারি চাকরির মূল দর্শন হওয়া উচিতÑযোগ্যতা + আইনগত যোগ্যতা + নিরপেক্ষতা।
ব্যক্তির অপরাধের দায় ব্যক্তির। ব্যক্তির চরিত্র যাচাই করুন, পরিবারের রাজনৈতিক চরিত্র নয়। কেউ জাল সনদ দিলে ব্যবস্থা নিন, কেউ রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ করলে তদন্ত করুন, কেউ গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হলে চাকরির আইনগত অযোগ্যতা থাকলে তাকে বাদ দিন-কিন্তু একজন প্রার্থীর বাবা কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক-এ কারণে সন্তানকে বাদ দেওয়ার যুক্তি কী? একজন প্রার্থীর ভাই অন্য দলের রাজনীতি করেন-এ কারণে প্রার্থী অপরাধী হয়ে যাবেন কেন? একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক নাগরিকের রাজনৈতিক মতাদর্শ তার নিজস্ব। সন্তান পিতার রাজনৈতিক মতাদর্শ উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে-এমন কোনো কথা নেই। রাষ্ট্র যদি পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যক্তির চাকরির যোগ্যতার মাপকাঠি বানায়, তাহলে নাগরিকের ব্যক্তিসত্তা কোথায় থাকে?
আরও একটি বাস্তব সমস্যা আছে। রাজনীতি পরিবর্তনশীল। আজ যে দল ক্ষমতায়, কাল সে দল বিরোধী হতে পারে। আজ যে রাজনৈতিক মতাদর্শ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য, কাল তার অবস্থান বদলে যেতে পারে। ফলে যদি সরকারি চাকরির নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মানদণ্ড হয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার চরিত্রও বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন একজন প্রার্থীকে আজ যে কারণে বাদ দেওয়া হলো, কয়েক বছর পর একই কারণে আরেক জনকে বাদ দেওয়া হতে পারে। এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর একটি দুষ্টচক্র। কারণ তখন সরকারি প্রশাসন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান না হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে ওঠানামা করা একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে।
উন্নত বিশ্বে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল দর্শনটি হলো-Background check থাকবে, কিন্তু তা যেন merit-based recruitment-কে প্রতিস্থাপন না করে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা কী? আমাদেরও পুলিশ বা গোয়েন্দা যাচাই বাদ দিতে হবে না। বরং সেটিকে আরও আইনসম্মত, প্রমাণভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি সংস্কার জরুরি। প্রথমত, ব্যক্তিগত দায় ও পারিবারিক পরিচয় আলাদা করতে হবে। প্রার্থীর নিজের বিরুদ্ধে মামলা, দণ্ড, গুরুতর অপরাধ বা চাকরির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আইনগত অযোগ্যতা থাকলে তা যাচাই করা হোক। দ্বিতীয়ত, ‘নেতিবাচক প্রতিবেদন’ শব্দটির নির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রয়োজন।
‘Negative’, ‘adverse’, ‘unsuitable’-এই শব্দগুলো খুবই গুরুতর। কিন্তু এগুলোর পেছনে কী ধরনের প্রমাণ থাকতে হবে? কোন অপরাধ, কোন মামলা, কোন সরকারি রেকর্ড? কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ? এসবের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকা উচিত। তৃতীয়ত, প্রার্থীকে জানাতে হবে, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিবেদন গেলে, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে যা প্রকাশ করা আইনত সম্ভব নয়, তা বাদ দিয়ে অন্তত সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও প্রতিকারের পদ্ধতি জানানো উচিত। কারণ একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, অথচ তিনি জানলেন না কেন-এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা ভাবার বিষয়। চতুর্থত, স্বাধীন পুনর্বিবেচনা ব্যবস্থা দরকার। ৪৩তম বিসিএসের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাময়িকভাবে নিয়োগের জন্য অনুপযুক্ত ২২৭ জনের যে কেউ পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন। এ ধরনের সুযোগ শুধু একটি বিসিএসের জন্য নয়, একটি স্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত। পঞ্চমত, সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার বিসিএস পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া এমনিতেই দীর্ঘ। এরপর যদি ভেরিফিকেশনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে একজন তরুণের বয়সসীমা শেষ হয়ে যেতে পারে। অন্য চাকরির সুযোগ চলে যেতে পারে। পারিবারিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ২০২০ সালের অনুসন্ধানে এমন প্রার্থীর কথাও এসেছে, যাদের বয়স পরে সরকারি চাকরির পরীক্ষার সীমা অতিক্রম করেছে। তাই ভেরিফিকেশনেরও একটি আইনসম্মত maximum time limit থাকা দরকার।
অন্যদিকে ভুল ভেরিফিকেশনের দায় কে নেবে? ধরা যাক, একজন প্রার্থীকে নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগ দেওয়া হলো না। পাঁচ বছর পর দেখা গেল, প্রতিবেদনটি ভুল ছিল। এরপর তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। কিন্তু এই পাঁচ বছরে তার বয়স বেড়ে গেল, ক্যারিয়ারের পাঁচটি বছর নষ্ট হলো, পরিবারে আর্থিক ক্ষতি হলো, মানসিক চাপ তৈরি হলো। এই ক্ষতির দায় নেবে কে? একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভুলের কোনো প্রতিকার থাকবে না? নাগরিকের জন্য শুধু দায়িত্ব, কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য কোনো জবাবদিহি থাকবে না? এই প্রশ্নগুলোকে আইন ও নীতির আলোচনায় আনতে হবে।
এখানে পিএসসির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। পিএসসি যদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিয়ে মেধাক্রম তৈরি করে এবং একজনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে, তাহলে সেই সুপারিশকে পরবর্তী প্রশাসনিক যাচাইয়ে বাতিল করার ক্ষমতা থাকতে পারে-যদি আইন তা অনুমোদন করে। কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে কারণ দেখানোর দায়িত্বও থাকা উচিত। নইলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
প্রথম প্রতিষ্ঠান বলছে ‘ব্যক্তি যোগ্য’, দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান একই ব্যক্তিকে বলছে, ‘অযোগ্য’। তৃতীয় প্রতিষ্ঠান বলছে-‘বিরূপ প্রতিবেদন আছে’। আর প্রার্থী দাঁড়িয়ে আছেন মধ্যখানে। তিনি জানেন না-তিনি আসলে অপরাধী, নাকি শুধু সন্দেহভাজন; তার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে, নাকি শুধু একটি রিপোর্ট আছে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া উচিত নয়। সংখ্যার চেয়েও বড় হলো নীতির প্রশ্ন: ৩২তম থেকে ৩৯তম বিসিএসে প্রায় ৪০০ জন। এর মধ্যে ২৩০ জন চিকিৎসক। ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএসে পরে নিয়োগ পাওয়া ২৫৯ জন। ৪৩তম বিসিএসে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাময়িকভাবে বাদ পড়া ২২৭ জন। এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে যোগ করে একটি ‘মোট’ সংখ্যা তৈরি করা যাবে না। কারণ সময়সীমা ও শ্রেণিবিভাগ আলাদা, এবং কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের বঞ্চনার মধ্যে পুনর্নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগুলো একটি বিষয় পরিষ্কার করে-এটি বিচ্ছিন্ন এক-দুই জনের সমস্যা নয়; সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় background verification-এর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্রের চাকরি কার? সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা, একজন চিকিৎসক, একজন প্রকৌশলী, একজন কৃষি কর্মকর্তা কিংবা একজন শিক্ষক-তারা শেষ পর্যন্ত কোনো দলের কর্মী নন; তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের আনুগত্যের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত সংবিধান ও আইনের প্রতি। রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তিত হবে। সরকার পরিবর্তিত হবে। মন্ত্রী পরিবর্তিত হবেন। দল পরিবর্তিত হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসন টিকে থাকবে। এই প্রশাসনের মেরুদণ্ড যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে রাষ্ট্র দুর্বল হবে। আর যদি মেধা, যোগ্যতা, সততা ও আইনের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে সরকার যে দলই পরিচালনা করুক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী থাকবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন-কিন্তু ভয় দেখানোর জন্য নয়; নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। গোয়েন্দা যাচাই প্রয়োজন-কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ বাছাই করার জন্য নয়; রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য। ব্যক্তির চরিত্র যাচাই প্রয়োজন-কিন্তু তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় বিচার করার জন্য নয়।
বিসিএস পরীক্ষা মেধা যাচাই করবে। পুলিশ ভেরিফিকেশন আইনগত ও নিরাপত্তাগত যোগ্যতা যাচাই করবে। গোয়েন্দা সংস্থা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রকৃত ঝুঁকি যাচাই করবে। আর শেষ সিদ্ধান্ত হবে প্রমাণ, আইন, নিরপেক্ষতা ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।
কারণ একজন তরুণ যখন লাখো প্রতিযোগীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে রাষ্ট্রের দরজায় পৌঁছান, তখন তার কাছে রাষ্ট্রের দরজা যেন অদৃশ্য কোনো রাজনৈতিক তালায় বন্ধ হয়ে না যায়। রাষ্ট্রের দরজা খুলুক তার যোগ্যতার চাবিতে। আর যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে দরজা বন্ধ করতেই হয়, তাহলে রাষ্ট্র অন্তত নাগরিককে বলুক-কোন আইনে, কোন প্রমাণে, কোন কারণে এবং কোন প্রতিকারের সুযোগে সেই দরজা বন্ধ করা হলো। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটিই নাগরিকের ন্যূনতম প্রত্যাশা।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক