একসময় গরমে তৃষ্ণা মেটানোর সহজলভ্য প্রাকৃতিক পানীয় ছিল ডাবের পানি। অসুস্থ মানুষের পথ্য হিসেবেও চিকিত্সকের পরামর্শে ডাব কেনা হতো। কিন্তু এখন রাজধানীর বাজারে ডাব কিনতে গিয়ে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত। আকারভেদে কোথাও কোথাও দাম আরো বেশি। অথচ দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদন এলাকায় গাছমালিকের কাছ থেকে একটি ডাব কেনা হচ্ছে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। অর্থাত্ গাছ থেকে রাজধানীর খুচরা বাজারে পৌঁছাতেই দাম বেড়ে যাচ্ছে প্রায় তিন গুণ।
ডাবের এই অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধানের পেছনে একদিকে রয়েছে চাহিদার চাপ, অন্যদিকে পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় এবং একাধিক হাতবদল। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য সংযোজনের স্বচ্ছ হিসাব না থাকায় কৃষক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কাওরান বাজারে প্রতি রাতে ঢুকছে দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা ডাব। সদরঘাটে পাইকারিবাজারেও প্রতিদিন নদীপথে প্রচুর ডাব আসে। সেখানে পরিবহন, শ্রমিক, আড়ত খরচ ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা যোগ হয়ে পাইকারি পর্যায়েই দাম বেড়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় পৌঁছাচ্ছে। এরপর খুচরা পর্যায়ে ডাবভেদে তা ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ঢাকায় প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫ লাখ ডাব আসে। কিন্তু চাহিদা তার চেয়ে বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গাছমালিকের কাছ থেকে আকারভেদে একটি ডাব গড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে কেনা হচ্ছে। এরপর স্থানীয় ব্যাপারি, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ডাব পৌঁছাচ্ছে রাজধানীর ভোক্তার কাছে। লক্ষ্মীপুরে গাছ থেকে ২৮ থেকে ৩০ টাকায় কেনা ডাব ঢাকার পাইকারি বাজারে গড়ে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় পাইকাররা জানিয়েছেন, কয়েক ধাপে হাতবদলের কারণে দাম তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
তবে ডাবের মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি নয়, সরবরাহ ও চাহিদার স্বাভাবিক অর্থনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কাওরানবাজারের ডাব ব্যবসায়ী আকরাম বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে ডাবের চাহিদা বেড়েছে। গরমে সাধারণ ক্রেতার চাহিদার পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডাব কেনার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে হাসপাতালকেন্দ্রিক ডাবের চাহিদাও বেড়েছে। এদিকে ডাবের সরবরাহ চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না।
পরিবহন ব্যয়ও বাড়িয়েছে দাম : দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকায় ডাব আনতে পরিবহন খরচও যুক্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রায় ৩ হাজার ডাবের একটি ট্রাক দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকায় আনতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া লাগে। অর্থাত্ শুধু পরিবহনেই প্রতি ডাবে প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা ব্যয় যুক্ত হয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, ওঠানো-নামানো, আড়ত খরচ, বাছাই, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, খুচরা বিক্রেতার ভ্যান ভাড়া এবং অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়।
ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামানও সামপ্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে আড়ত, পাইকার, ফড়িয়া ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা থাকার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, অথচ রোগীরা ভোক্তা পর্যায়ে বেশি দামে ডাব কিনছেন।
প্রধান জোগান দক্ষিণাঞ্চল থেকে: ঢাকার ডাবের বাজার মূলত দেশের দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে ডাব আসে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর ডাবের অন্যতম বড় উৎপাদন অঞ্চল। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, জেলায় প্রায় ৩০ লাখ ৭৫ হাজার নারিকেলগাছ রয়েছে এবং ২ হাজার ৫৬৩ হেক্টর জমিতে নারিকেল চাষ হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় নারিকেল উৎপাদন ছিল ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। শুধু লক্ষ্মীপুর থেকেই প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক ডাব ঢাকায় আসে। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ডাব থাকতে পারে।