আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠিত হইবে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১। ইহার আগে বৈশ্বিক এই সংস্থাটি মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তাকে জলবায়ু মোকাবিলার নীতি ও অর্থায়নের মূল ধারায় আনিবার আহ্বান জানাইয়াছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেই সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক দেখা দেয়, তাহাতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হন নারীরা। ইহার সপক্ষে প্রমাণস্বরূপ দুইটি প্রতিবেদনের কথা বলা যাইতে পারে। যেমন—ফিজিতে গত সোমবার হইতে শুরু হইয়াছে প্রি-কপ সম্মেলন। এই সম্মেলনে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলিয়াছেন যে, চরম তাপমাত্রা অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকের ঝুঁকি বাড়াইতেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, পশ্চিম ইউরোপ, সাহেল অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকার প্রায় ৩৩টি দেশ এই বৎসর সবচাইতে উষ্ণ জুলাই অবলোকন করিয়াছে। দেখা গিয়াছে, এই সকল দেশে অধিক তাপমাত্রার কারণে নারীদের সময়ের আগে সন্তান জন্মগ্রহণ করিতেছে। অনেক নারী প্রসব করিতেছেন মৃত সন্তান বা কম ওজনের শিশু। ইহার সহিত মায়ের শারীরিক নানা জটিলতার সম্পর্কও রহিয়াছে।
উপরিউক্ত চিত্রটি উদ্বেগজনক। ইহাতে বুঝা যায়, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা ও সন্তান জন্মদান এখন বৈশ্বিক জলবায়ুসংকটের নূতন এক ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হইয়া উঠিতেছে। ওয়েলকামের চেয়ারম্যান ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড তো এক ধাপ আগাইয়া গিয়া বলিয়াছেন যে, মা ও নবজাতকের জন্য চরম তাপমাত্রা ঘাতকস্বরূপ। এইদিকে গত সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার মতো জলবায়ু দুর্যোগ মেয়েদের বাল্যবিবাহ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াইতেছে। এই প্রতিবেদনটির নাম : চেঞ্জ হার ফরকাস্ট : দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস গার্লস ২০২৬। ইহার মূলকথা হইল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ, কেনিয়া, পেরু, সেনেগাল ও জিম্বাবুয়ের মতো দেশে নারীরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে নিপতিত। যেমন—বাংলাদেশে বন্যার পর পরিবার নিঃস্ব হইয়া পড়িলে আর্থিক সংকটের কারণে মেয়েদের অল্প বয়সেই বিবাহ দেওয়া হয়। দুর্যোগ দেখা দিলে স্কুল বন্ধ হইয়া যায়। ইহাতে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়ে। ইহাতে তাহারা স্বাস্থ্যসেবা পাইতেও সমস্যায় পড়েন। আবার দুর্যোগের পর নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়িয়া যায়। বিশেষ করিয়া আশ্রয়কেন্দ্রে তাহারা নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। এখন এই সকল সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। জলবায়ুনীতি, পরিকল্পনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিকট এই সংক্রান্ত সাহায্য-সহযোগিতা পৌঁছাইয়া দিতে হইবে।
জলবায়ুসংকট ও নারী সুরক্ষার এই নূতন চ্যালেঞ্জ লইয়া আমাদের গভীর চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। কেননা সংকটকালে এইপ্রকার মানবিক বিপর্যয় সার্বিক সামাজিক বিকাশকে ব্যাহত করে। বিশেষ করিয়া সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ও বাস্তুচ্যুত বালিকাদের নিকট পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছাইবার দিকে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের সবিশেষ নজর প্রদান করা আবশ্যক। আসন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনসমূহে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিকট জলবায়ু মোকাবিলা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণীতে নারী ও কন্যাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুরক্ষার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব লাভ করুক— ইহাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। বস্তুত সমবেত প্রচেষ্টা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাই এই অমানবিক সংকট হইতে আমাদের দুর্যোগপ্রবণ প্রান্তিক কন্যাদের রক্ষা করিতে পারে।