স্কুল থেকে ছাত্রী অপহরণের চেষ্টাকালে নারী আটক: উদ্ধারে গিয়ে জনতার হামলায় আহত ৪ পুলিশ

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে স্কুল চলাকালে তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বাবার দুর্ঘটনার মিথ্যা খবর দিয়ে ফুসলিয়ে অপহরণের চেষ্টাকালে প্রিয়া আক্তার (২৪) নামের এক নারীকে হাতেনাতে আটক করেছে স্থানীয় জনতা। উত্তেজিত জনতা ওই নারীকে গণধোলাই দিয়ে আটকে রাখলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে চরম তোপের মুখে পড়ে পুলিশ। অবরুদ্ধ নারীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসার পথে ক্ষুব্ধ জনতার ইটপাটকেল ও হামলায় চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করা হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে কটিয়াদী পৌরসভার বেথইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। আটক প্রিয়া আক্তার পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর উপজেলার দিঘিরপাড় গ্রামের টিপু মিয়ার স্ত্রী। উদ্ধার হওয়া নয় বছর বয়সী শিশু ইলমা আক্তার স্থানীয় বেথইর মহল্লার বাসিন্দা জামাল মিয়ার মেয়ে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কিশোয়ার সুলতানা জানান, দুপুরের বিরতির সময় বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ সময় কালো বোরকা পরিহিত এক অজ্ঞাত নারী সেখানে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ইলমাকে ‘তোমার বাবা রাস্তায় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন’ বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভয় দেখান এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে বের করে নিয়ে যান। বিষয়টি সহপাঠীদের চোখে পড়লে তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দপ্তরিকে জানায়। খবর পেয়ে শিক্ষক, শিশুটির অভিভাবক ও স্থানীয় লোকজন চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

পরবর্তীতে বিদ্যালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে পিপুলিয়া এলাকায় একটি অটোরিকশা আটকিয়ে ইলমাকে উদ্ধার করা হয় এবং অভিযুক্ত নারী প্রিয়া আক্তারকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন এলাকাবাসী। উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থী ইলমা জানায়, বাবার দুর্ঘটনার কথা বলে তাকে গাড়িতে তোলার পর চলন্ত অটোরিকশাতেই তার কানের স্বর্ণের দুল খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন ওই নারী। আটকের পর বিক্ষুব্ধ জনতা ওই নারীকে গণধোলাই দিয়ে এনে বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখে।

ঘটনার খবর পেয়ে কটিয়াদী মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ অবরুদ্ধ নারীকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করে নিজেদের পিকআপ ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে আসার চেষ্টা করতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নারীকে নিজেদের হাতে বিচার করার দাবিতে উত্তেজিত জনতা লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয় এবং ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের গাড়ির সামনের গ্লাস ও বাম্পার ভেঙে তছনছ হয়ে যায় এবং ইটের আঘাতে চার পুলিশ সদস্য রক্তাক্ত হন।

হামলায় আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন—এসআই মো. মাসুদ রানা, কনস্টেবল আতাউর রহমান, কনস্টেবল সারোয়ার হোসেন ও কনস্টেবল আল আমিন। পরে তাঁদের এবং উদ্ধার হওয়া শিশু ও আটক নারীকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মিঠুন রানা জানান, প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর আহত পুলিশ সদস্য, শিশু ও আটক নারী সবাই শঙ্কামুক্ত রয়েছেন।

আহত এসআই মো. মাসুদ রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অভিযুক্ত নারীকে আইন অনুযায়ী হেফাজতে নেওয়ার সময় উত্তেজিত জনতা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে ফের গণপিটুনি দেওয়ার অপচেষ্টা করে এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে চারজন পুলিশ সদস্য আহত ও সরকারি গাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার এই ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।