ফরিদপুরের সদরপুরে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি কমতে শুরু করলেও কমছে না ভাঙনের তীব্রতা। বরং শরৎকালেও নদী দুটির সর্বগ্রাসী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি। চোখের সামনে প্রিয় আবাস ভূমি ও ফসলের মাঠ নদীগর্ভে হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় দিন কাটছে নদীতীরের বাসিন্দাদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নে পদ্মার তীরবর্তী শয়তানখালী ঘাট, চেয়ারম্যান ঘাট ও মুন্সীরচর এলাকায় তীব্র ভাঙন চলছে। একইভাবে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনের কবলে পড়েছে পার্শ্ববর্তী চরনাছিরপুর ইউনিয়নের বাবুরালি মোল্যার কান্দি, শিমুলতলী, নাজির শিকদার কান্দি, মনিরদ্দিন ফকির কান্দি, কাজি কান্দি ও শিকদার কান্দিসহ বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকা। মাইলের পর মাইল নদীপাড় ভেঙে বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে।
নদীভাঙনের আশঙ্কায় অনেক পরিবার আগেভাগেই বসতবাড়ি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে রক্ষা পাচ্ছে না তাদের ফসলি জমি। জমিতে রোপণ করা আধাপাকা ও কাঁচা ধানও তলিয়ে যাচ্ছে নদীতে। ফলে নিরুপায় হয়ে কৃষকেরা ঘরে তোলার আগেই ধান কেটে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন। যে ফসল দিয়ে পরিবারের সারা বছরের খোরাক জোগানোর স্বপ্ন ছিল, তা এখন পরিণত হচ্ছে গবাদিপশুর খাবারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বর্ষা শেষ হওয়ার পর পদ্মায় এমন তীব্র স্রোত ও ভাঙন আগে কখনও দেখা যায়নি। তাদের ধারণা, বাগড়া ঘাট থেকে দিয়ারা ও চরনাছিরপুর-ঝাউকান্দা হয়ে পদ্মা নদী শাসনের প্রায় ১৭ কিলোমিটার কাজ হওয়ার পর তা বন্ধ থাকায় নদীর স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এতে সদরপুরের দিকে স্রোতের চাপ বেড়ে ভাঙন তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নদীপাড়ের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত পদ্মা নদী শাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে বহু পরিবারকে পথে বসতে হবে।
এদিকে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে চরনাছিরপুর ইউনিয়নের আশ্রয়কেন্দ্র, ঢেউখালী ইউনিয়নের শতবর্ষী পিঁয়াজখালী হাট, জনসংঘ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, চরনাছিরপুর উচ্চবিদ্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, ছোট-বড় বাজার ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এসব স্থাপনা ও জনপদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী ঘাটের ইজারাদার মানিক ব্যাপারী বলেন, পদ্মা যে হারে নদী ভাঙছে, তাতে আগামী বছর পিঁয়াজখালী হাট বলে আর কিছু থাকবে না। শুনেছি, উজানে নদী শাসনের কাজ বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে বিশাল বালুর স্তূপ জমে আছে। এতে নদীর স্রোতের গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে।
আকোটের চর পদ্মা পাড়ের জনসংঘ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আইয়ুব আলী বলেন, নদীভাঙন অত্যন্ত তীব্র। প্রতিদিনই ভাঙন বাড়ছে। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। কখনও ভাবিনি এত অল্প সময়ে নদী আমাদের এতটা কাছে চলে আসবে।
আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনের মুখে পড়া চরনাছিরপুরের কৃষক মো. জয়নাল বলেন,
আর কিছুদিন সময় পেলেই ধান ঘরে তুলতে পারতাম। কিন্তু নদী যেভাবে ভাঙছে, তাতে জমি রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান গরুর খাবার হিসেবে কেটে নিয়ে যাচ্ছি। চোখের সামনে নিজের ফসল নষ্ট হতে দেখা খুব কষ্টের।
চরনাছিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রোকন উদ্দিন বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবনটিও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে এই ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। জনপদ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঢেউখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বয়াতি বলেন, আমার জীবনে এত তীব্র ভাঙন দেখিনি। চোখের সামনে মাত্র ২০ মিনিটে প্রায় ৫০০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রস্থের একটি এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। ভাঙনের গতি ভয়াবহ। সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদী শাসনের কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে।
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সরকার অবগত রয়েছে। পদ্মা নদী শাসনের বিষয়টি প্রকল্প আকারে একনেকে তোলা হয়েছে। বর্তমানে তা পর্যালোচনাধীন রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছি, খুব শিগগিরই একটি স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে।