শিশু আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিচারিক বিশৃঙ্খলা

হাইকোর্ট বলেছে, শিশু আইনের কয়েকটি ধারায় অসংগতি, সাংঘর্ষিক অবস্থা, বিভ্রান্তি ও অস্পষ্টতা বিদ্যমান। এগুলো অবিলম্বে দূর করা প্রয়োজন। এই আদালত প্রত্যাশা করছে সরকার এ ব্যাপারে দ্রুততার সঙ্গে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তবে সরকার কর্তৃক আইনের যথাযথ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও শিশু আদালতকে সাত দফা কার্য পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বলেছে, দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা বলতে আমাদের দ্বিধা নেই যে, শিশু আইন ও আদালত নিয়ে বর্তমানে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগে এক ধরনের বিচারিক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। ঢাকার লালবাগে শিশু ওসমান হত্যা মামলায় হূদয়ের জামিন সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে এ রায় দেওয়া হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, এ মামলায় অপরাধ আমলে নেওয়ার পূর্বেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক আপিলকারীর (হূদয়) বয়স নির্ধারণ ও জামিন সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শিশু আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। শিশু আদালত হিসেবে ঐ ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ার ছিল কি না, সেটাই বিচার্য বিষয়।

এ প্রসঙ্গে শিশু আইনের বেশ কয়েকটি ধারা পর্যালোচনা করে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, এটা বাস্তবতা যে, শিশু আইনের ধারা ২(১৬ক), ১৫ক এবং ১৬(৩) সংযোজিত হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের সংশয়, বিভ্রান্তি এবং সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিতের লক্ষ্যে সৃষ্ট সংশয়, বিভ্রান্তি ও অসংগতি দূর করা অতি জরুরি। এছাড়া শিশু আইনের অধীনে কোনো আদেশ প্রদানকালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের নাম, সিল ও পদবি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। আমরা লক্ষ করছি যে, বিচারপূর্বকালীন সময়ে বিভিন্ন আদেশ প্রদানকালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের নাম, সিল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিচারকগণ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে আদেশে স্বাক্ষর করছেন, যা বর্তমান মামলার ক্ষেত্রেও হয়েছে। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় হাইকোর্টের অভিমত হচ্ছে, এ ধরনের বিভিন্নমুখী প্রবণতার মূল কারণ শিশু আইনের ধারা ১৫ক এবং ১৬(৩)-এর সংযোজন। কারণ ঐ দুটি ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ আমলে গ্রহণের পর শিশু আদালতে মামলার নথি (কাগজাদি) প্রেরিত না হওয়া পর্যন্ত শিশু আদালত কোনো অপরাধ বিচারের জন্য গ্রহণ করতে পারবে না।

গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাসমূহ : সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কেবলমাত্র মামলার তদন্ত কার্যক্রম তদারকি এবং এ সংক্রান্ত দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় আদেশ ও নির্দেশনা প্রদান করবেন। রিমান্ড সংক্রান্ত আদেশ শিশু আদালতেই নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। তবে, আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু (ভিকটিম এবং সাক্ষী) বা আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর জবানবন্দি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করতে পারবেন। তদন্ত চলাকালীন সময়ে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুকে মামলার ধার্য তারিখে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা হতে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। তদন্ত চলাকালে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর রিমান্ড, জামিন, বয়স নির্ধারণসহ অন্তর্বর্তী যে কোনো বিষয় শিশু আদালত নিষ্পত্তি করবে এবং এ সংক্রান্ত যে কোনো দরখাস্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট নথিসহ ঐ দরখাস্ত সংশ্লিষ্ট শিশু আদালতে প্রেরণ করবেন। সংশ্লিষ্ট শিশু আদালত ঐ বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করবে। গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এ রায় প্রকাশ পেয়েছে।