এলপিজি বাজারের অস্থিরতার নেপথ্যে

সাম্প্রতিককালে দেশের খুচরা বাজারে এলপিজি গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কোনো কোনো জায়গায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বেঁধে দেওয়া দামের চেয়েও বেশিতে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। কোনো কোনো এলাকাতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকার কারণে ভোক্তরা সিলিন্ডারও পাচ্ছেন না। কিন্তু এলপিজি সিলিন্ডারের দাম হঠাত্ এত বেড়ে যাবার কারণ কী? 

এ খাতের শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং পরিবহন ও সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দেশে এলপিজি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এ কারণগুলো দেশের বাজারে এলপিজির দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। 

বাজারে এলপিজি সরবরাহ করে এমন কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলপিজির চাহিদা বাড়ার জন্য বেশকিছু ঘটনা কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া। গত কয়েক বছরে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ অনেক কমেছে। এতে অনেকে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বাজারে এলপিজি সরবরাহ করত এমন দুই-একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি এবং সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে চাপ আরো বেড়েছে।

এদিকে, এলপিজি সিলিন্ডারের বিক্রির দর নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কোম্পানিগুলো জানায়, তারা বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করেন। এ সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র সরকারিভাবে যাচাইয়ের সুযোগ আছে। কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় সরবরাহের ঘাটতি থাকায় খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম রাখেন। এতে করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাইকারি দামের চেয়ে খুচরা মূল্য ৪০০ টাকারও বেশি ব্যবধান হয়। কেউ কেউ এজন্য মুল কোম্পানিগুলোকে দায়ী করেন। অথচ খুচরা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং করার জন্য সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি রয়েছে।

এ বিষয়ে ওমেরা এলপিজির চিফ অপারেটিং অফিসার মাথেন্দ্র ডি যয়োশা ইত্তেফাককে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি অর্থায়নে সীমাবদ্ধতা এবং দেশের বাজারে সরবরাহের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেও নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম বজায় রেখেছে ওমেরা পেট্রোলিয়াম। একদিকে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে নির্ভরযোগ্য এলপিজি সরবরাহ প্রত্যাশা করছেন, অন্যদিকে বিভিন্ন আর্থিক ও পরিচালনগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তিনি বলেন, ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা ও আমদানিতে অর্থায়নের জটিলতার কারণে দেশের বেশ কয়েকটি বড় এলপিজি অপারেটর তাদের স্বাভাবিক আমদানি কার্যক্রম বজায় রাখতে পারছে না। এর ফলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে এবং চাহিদার তুলনায় এলপিজির প্রাপ্যতায় ব্যবধান দেখা দিয়েছে। মাথেন্দ্র যয়োশা বলেন, এলপিজি সংগ্রহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও ওমেরার আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালনগত প্রস্তুতির কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করেছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওমেরার নিজস্ব আমদানি কার্যক্রম নিয়মিত থাকলেও বাজারের সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান সরবরাহ সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তার মতে, বিইআরসি গত অক্টোবর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে কোনো কোনো খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে ওমেরা সরকার নির্ধারিত মূল্যসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অননুমোদিত মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগকে সমর্থন করে। তবে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমদানিকারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং পরিবেশকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমদানি অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভোক্তাদের জন্য এলপিজির প্রাপ্যতা উন্নত করা সম্ভব।

বাংলাদেশে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইগ্যাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনেকে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ার জন্য কোম্পানিগুলোকে দায়ী করছে। কিন্তু আমরা বলতে পারি, আমাদের কোম্পানির পণ্য আমদানির তথ্য এবং বিক্রির সব তথ্য যে কেউ ট্র্যাক করতে পারেন। দৈনন্দিন বিক্রির রেকর্ডও আমরা সংরক্ষণ করি। যে কেউ ইচ্ছে করলে এসব দেখতে পারে। বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের স্বল্পতা নিয়ে আইগ্যাস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক তেল এবং গ্যাসের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক জাহাজ এখন মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রমুখী। এ কারণে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আনতে গেলে অনেক বেশি প্রিমিয়াম দিতে হয়। বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোম্পানিটি বলছে, সরকারি সংস্থা বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। সব কোম্পানিকে এটি মেনে চলতে হয়। আর এটি শুধুমাত্র একটি কোম্পানির ওপর নির্ভর করে না। বাজারে আরো কোম্পানি আছে। তাহলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কবে?—এমন প্রশ্নের জবাবে আইগ্যাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটা বলা মুশকিল। উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর এটা নির্ভর করে। খুব তাড়াতাড়ি যে এটি হচ্ছে না, তা বলাই যায়। কারণ যে অবকাঠামোগুলোর ক্ষতি হয়েছে তা ঠিক করতে সময় লাগবে। এছাড়া জাহাজগুলোকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ও আছে।